অনুমোদনহীন ৪৫৭ ফার্মেসি, তদারকি নেই ঔষধ প্রশাসনের
.
সনি আজাদ, (চারঘাট) রাজশাহী
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৬
চারঘাটের পিরোজপুর গ্রামের আফরোজা বেগম উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিক রোগী। সপ্তাহখানেক আগে অসুস্থ হয়ে পড়লে ‘পল্লী চিকিৎসক’ মমিন আলীর কাছে গেলে পরীক্ষা করে দেখেন প্রেশার অনেক বেশি। কয়েক ধরনের ওষুধ দেন। পাশাপাশি দুর্বলতা কাটাতে আমলকি নামে ইউনানি ভিটামিন ওষুধ দেন। সেই ওষুধ খাওয়ার পর আফরোজার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
মমিন আলী তিন মাস আগেও বাঁশের সরঞ্জাম তৈরি করতেন। বর্তমানে সকাল হলেই ব্যাগে প্রেশার ও ডায়াবেটিস মাপার যত্ন নিয়ে ঘুরে ঘুরে রোগী দেখছেন। ৫০ টাকার ভিটামিন ‘আমলকি’ ৩৫০ টাকায় বিক্রি করেন।
নিমপাড়া গ্রামের খায়রুল ইসলাম তাঁর সাত বছর বয়সি ছেলের হঠাৎ জ্বর আসায় তাকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে ওষুধ না পেয়ে স্থানীয় পল্লী চিকিৎস রবিউল ইসলামের কাছে গেলে তিনি অ্যান্টিবায়োটিক ও দুর্বলতা কাটাতে ভিটামিন ইউনানি ওষুধ দেন। এতে সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাকে রাজশাহী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানান ডেঙ্গু হয়েছে।
খায়রুল ইসলাম বলেন, পল্লী চিকিৎসকের কথা শুনে ছেলে বাড়িতে রাখলে হয়তো জীবিত দেখতে পেতাম না। কথা হলে পল্লী চিকিৎসক পরিচয়দানকারী মমিন আলী ও রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিজেদের ডাক্তার হিসেবে দাবি করি না। তবে অভিজ্ঞতা আছে। সেজন্য চিকিৎসা দিয়ে থাকি। এটি দোষের কিছু না।’
শুধু মমিন আলী বা রবিউল ইসলাম নন, চারঘাটের আনাচেকানাচে রাতারাতি পল্লী চিকিৎসক বনে ফার্মেসি দোকান খুলে বসছেন কুলি, রাজমিস্ত্রি, মুদি দোকানিরা। কেউ গ্রামে গ্রামে ঘুরে এবং কেউবা ফার্মেসিতে বসে চিকিৎসা দিচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। প্রশাসনের নাকের ডগায় অনুমোদন ছাড়াই ফার্মেসি ব্যবসা ও অপচিকিৎসা দিলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না তাদের বিরুদ্ধে।
ঔষধ প্রশাসন রাজশাহীর তথ্যমতে, জেলায় ৪ হাজার ১০০টি অনুমোদিত ফার্মেসি আছে। এর মধ্যে চারঘাটে রয়েছে ২১৭টি। চারঘাটের আনাচকানাচে অনুমোদনহীন ফার্মেসি রয়েছে আরও ৪৫৭টি। কেবল ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে তাদের কেউ বাড়িতে, মোড়ে কিংবা স্থানীয় বাজারে ফার্মেসি খুলে ব্যবসা করছেন। পল্লী চিকিৎসার নামে ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক, নিষিদ্ধ, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। এসব তথ্য নিশ্চিত বলে নিশ্চিত করেছে উপজেলা কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি।
উপজেলা কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেন্টু বলেন, কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই অনেকে রাতারাতি ফার্মেসি খুলে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করছেন। ৫০ টাকার অবৈধ কোম্পানির ওষুধ কিনে ৩৫০-৪০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। বিষয়টি বারবার বলার পরেও প্রশাসন অভিযান চালায় না।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রাজশাহী (সার্কেল-খ)-এর পরিদর্শক সাইফুল আলম বলেন, রাতারাতি এখানকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ফার্মেসি ব্যবসায় জড়িয়েছেন। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে সংগ্রহের পর নিষিদ্ধ সিরাপ ও ট্যাবলেট বিক্রি করছেন। মাঝেমধ্যেই আমরা চারঘাটের বিভিন্ন ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে এসব ট্যাবলেট উদ্ধার করে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।
ঔষধ প্রশাসন রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, অনুমোদন না নিয়ে ফার্মেসি পরিচালনা করা যাবে না। অনেকেই সে নিয়ম মানছেন না। তবে অভিযোগ পেলেই অভিযান চালানো হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌফিক রেজা বলেন, সভা-সমাবেশ করে সাধারণ রোগীদের এ বিষয়ে সচেতন করা হয়। চিকিৎসক বা সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া কেউ যেন চিকিৎসা না নেয়। এরপরও অনেকে প্রতারকদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- ফার্মেসি
