আশ্রয়ণের অধিকাংশ ঘর ভাড়া, বিক্রি
.
জিয়াউল হাসান পলাশ, ঝালকাঠি
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫২
ভূমিহীনদের জন্য ৪৫টি ঘর নির্মাণ করে দেয় সরকার। তবে এসব ঘরে থাকছে না অসহায় কোনো পরিবার। রাজনৈতিক প্রভাব আর টাকার বিনিময়ে বরাদ্দ নিয়ে অধিকাংশ ঘর ভাড়া ও বিক্রি করে দিয়েছেন সচ্ছল ব্যক্তিরা। এমন ঘটনা ঘটেছে ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়নের কুনিহারী আশ্রয়ণ প্রকল্পে। এই প্রকল্পের ঘরগুলো ২০২১ সালে বরাদ্দ দেওয়া হয়।
গত ৫ সেপ্টেম্বর সরেজমিন দেখা যায়, প্রকল্পের ৩৫ নম্বর ঘর তালাবদ্ধ। ঘরের সামনে লাকড়িতে ভরা। বাসিন্দারা জানান, সাবেক ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম তাঁর ছেলে মিলন মাঝির নামে ঘরটি বরাদ্দ নিয়ে দখলে রেখেছেন। এ রকম একাধিক ঘর সচ্ছলদের দখলে। তাদেরই একজন আনোয়ার হোসেন। ছয় লাখ টাকা খরচ করে মাছের ঘের, ছাগল, হাঁস-মুরগির খামার গড়ে তুলেছেন। এর পরও আশ্রয়ণের ১৫ নম্বর ঘরে বসবাস করছেন তিনি। পাশের ১৬ নম্বর ঘরটি ভাড়া নিয়ে মুরগি পালন করছেন আনোয়ার। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সে (১৬ নম্বর ঘরের মালিক) ভাড়া দিতে পারলে আমার নিতে দোষ কোথায়।’
তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান মরহুম মোবারক হোসেন মল্লিক টাকার বিনিময়ে আশ্রয়ণের ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘরের অধিকাংশ বাসিন্দাই সচ্ছল। তাদের কেউ ঘর না পাওয়া পরিবারের কাছ থেকে মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে, কেউ এককালীন টাকার বিনিময়ে ঘর দিয়ে চলে যায়। বেশ কয়েকটি ঘর তালাবদ্ধ করে দখল করে রাখা হয়েছে। অথচ আশ্রায়ণ প্রকল্পের এসব ঘর বিনামূল্যে অসহায় পরিবারকে দেওয়ার জন্য নির্মাণ করে সরকার। এক থেকে দেড় লাখ টাকায় ১১টি ঘর বিক্রি করা হয়েছে বলে জানান এই আশ্রয়ণের সভাপতি রাশিদা ও সাধারণ সম্পাদক রেনু বেগম। বাকি ঘরগুলো মাসিক ভাড়ায় এবং কয়েকটি ঘর সচ্ছলরা দখলে রেখেছে।
সভাপতি রাশিদা বেগম জানান, বরাদ্দ দেওয়ার পর থেকে সাবেক ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগমের ৩৫ নম্বর ঘর, শাহিদার ৬, মিলনের ১৪, জেসমিনের ১৭, রাবেয়ার ২২, খাদিজার ২৩ নম্বর ঘরে আজ পর্যন্ত বসবাস করছে না কোনো পরিবার। ঘরগুলো তালাবদ্ধ করে দখলে রাখা হয়েছে। সরকারি অনুদান এলে তারা ঘরে চলে আসেন।
আশ্রয়ণের ১১ নম্বর ঘর বরাদ্দ পান রেনু বেগম। এটি হালিমা বেগম নামে এক নারীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। ৪৯ নম্বর ঘর বরাদ্দ পান অমলকান্তি দে। তাঁর ঘরটি আনোয়ারা নামে এক নারীর কাছে বিক্রি করেছেন। ৩৯ নম্বর ঘর বরাদ্দ পান মিঠুন দত্ত। তাঁর ঘর অসিম নামে একজনের কাছে বিক্রি করেছেন। অসিমের মা মনজু জানান, তাঁর ছেলে এক লাখ টাকার ওপরে দিয়ে ঘরটি ক্রয় করেছেন।
১০ নম্বর ঘর সুন্দর আলী নামে একজনের কাছে বিক্রি করেছেন পরিবানু। ১৫ নম্বর ঘর বরাদ্দ নিয়ে আনোয়ার হোসেনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন জ্যোৎস্না বেগম। আনোয়ার হোসেন জানান, এক লাখ ৩০ হাজার টাকায় ঘরটি ক্রয় করেছেন।
২৯ নম্বর ঘর বরাদ্দ নিয়ে ইব্রাহিম নামে এক লোকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন লক্ষ্মী। ৩৬ নম্বর ঘর বরাদ্দ পান বেলায়েত। নিজাম নামে একজনের কাছে ঘরটি বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। ৪১ নম্বর ঘর বরাদ্দ নিয়ে বিক্রি করেছেন সাইদুল ইসলাম। ৪৪ নম্বর ঘর বরাদ্দ পান শাহিন মিয়া। তাঁর ঘরটি এক লাখ ১৫ হাজার টাকায় কিনে নিয়েছেন মো. মিলন নামে এক ব্যক্তি। ১৩ নম্বর ঘর বরাদ্দ পেয়ে রাহেলা বেগম নামে এক নারীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন জাকিয়া। ৩১ নম্বর ঘর বরাদ্দ পান জাবেদ হাওলাদার। সুমা নামে এক নারীর কাছে এক লাখ ২০ হাজার টাকায় ঘরটি বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েক বাসিন্দা জানান, সভাপতি রাশিদা বেগমের ঘর নম্বর ২৪। এই ঘর বিক্রির জন্য ২০ হাজার টাকা বায়না নিয়েছেন তিনি। যারা ঘর ক্রয় করেছেন তাদের ভাষ্য, তাদের জায়গাজমি কিছু নেই। এ কারণে টাকা দিয়ে ঘর কিনেছেন। যারা সরকারি ঘর বিক্রি করেছে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিলে ভালো হয়। তারা জানতেন না যে, সরকারি ঘর বিক্রি করা যায় না। সরকারি ঘর কীভাবে বেচাকেনা হয়, জানতে চাইলে তারা জানান, দলিলের পেছনে বরাদ্দপ্রাপ্ত মালিক ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করার কথা লিখে দেয়।
স্থানীয়রা জানান, সঠিকভাবে তদন্ত হলেই দেখা যাবে অনেক পরিবার ঘর পাওয়ার পরেও সেখানে বসবাস করছে না।
আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের অভিযোগ– পাঁচটি গভীর নলকূপের মধ্যে চারটি, ৯টি অগভীর নলকূপের মধ্যে পাঁচটি তিন বছর ধরে বিকল। দুটি নলকূপ চুরি হয়েছে। তাদের আরেকটি সমস্যা, ঘাটলা নেই। ঘাটলা না থাকায় খালের পানি ব্যবহার করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, সরকারি ঘর কেউ বিক্রি, ভাড়া বা হস্তান্তর করতে পারবেন না। সরকার ভূমিহীন পরিবারকে ঘর দিয়েছে বসবাসের জন্য, বিক্রির জন্য নয়। ঘর বিক্রি করার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। যদি কেউ বিক্রি করে থাকেন, তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- আশ্রয়ণ
