ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ম্যাগনেটিক কয়েন বিক্রির ফাঁদে চট্টগ্রামের শিল্পপতি

ম্যাগনেটিক কয়েন বিক্রির ফাঁদে চট্টগ্রামের শিল্পপতি
×

.

 আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৭ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১২:১০

হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার দারুণ দখল আবুল কালাম আজাদ ফাইয়ুমের। মুহূর্তেই কথার জাদুতে বশ করতে পারেন যে কাউকে। ‘ব্যক্তিত্ববান’ প্রমাণ করতে চড়েন অর্ধকোটি টাকার প্রাইভেটকারে। ভারতীয় পরমাণু বিজ্ঞানী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ ম্যাগনেটিক কয়েনের গুণাগুণ শিল্পপতি আবু বক্কর চৌধুরীর সামনে তুলে ধরেন ‘বিজ্ঞানী’ আজাদ। তিনি জানান, এক কয়েন বিক্রিতেই মিলবে কয়েকশ কোটি টাকার ডলার! এই ফাঁদে পড়েন শিল্পপতি আবু বক্কর।

লাকসাম শিল্প গ্রুপের স্বত্বাধিকারী সাজেন জনৈক মাহাবুবুল আলম। তিনি ম্যাগনেটিক কয়েন সংগ্রহে প্রাথমিকভাবে অর্থ লগ্নি করেছেন বলে জানানো হয়। আমেরিকার টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি কোম্পানির সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ ম্যাগনেটিক কয়েন বিক্রির আলোচনা চূড়ান্ত বলে নিশ্চিত করেন কথিত কান্ট্রি ডিরেক্টর তোফাজ্জল হোসেন মোল্লা। এভাবে কেউ বিজ্ঞানী, কেউ কান্ট্রি ডিরেক্টর, কেউ গ্রুপ অব কোম্পানির মালিক সেজে ফাঁদে ফেলেন আবু বক্কর চৌধুরীকে। বিদেশ থেকে ডলার আনতে এখন শুধু বড় শিল্প গ্রুপের একটি ব্যাংক হিসাব প্রয়োজন। দেরি না করে শিল্পপতি আবু বক্কর দিয়ে দেন বায়েজিদ গ্রুপের ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের অনুমতি। প্রাথমিক খরচের কথা বলে দুই দফায় তিন কোটি ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তারা।

এমন অভিনব প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে। দীর্ঘ ১০ বছর তদন্ত শেষে গত ১১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রতারণায় জড়িত কথিত শিল্পপতি সিরাজগঞ্জের বেলকুচির বাসিন্দা মাহাবুবুল আলম, নওগাঁর মান্দার বালুবাজার এলাকার তোফাজ্জল হোসেন মোল্লা, মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাধাইগুর এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ কাইয়ুম, মৌলভীবাজারের বড়লেখার আখালিমুরার বাসিন্দা শীতল বাবুর নাম অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।  

অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণায় জড়িত থাকার প্রমাণ পেলেও সঠিক নাম-ঠিকানা না পাওয়ায় কথিত নুরুল আমিন, মো. হাসান, মহিউদ্দিনকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। 
সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক মনিরুজ্জামান বলেন, মামলাটি আমার আগে ছয়জন কর্মকর্তা তদন্ত করেছেন। সবার তদন্ত সমন্বয় করে আমরা প্রতারণার বিস্তারিত অভিযোগপত্রে তুলে ধরেছি। এ ঘটনায় চারজনকে শনাক্ত করা গেলেও বাকিদের চিহ্নিত করা যায়নি। 

বায়েজিদ গ্রুপের চেয়ারম্যান আবু বক্কর চৌধুরীর মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি ধরেননি। তাঁর পক্ষে করা মামলার বাদী বায়েজিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান সমকালকে বলেন, প্রতারকরা কথার জাদুতে ফেলে স্যারকে ফাঁদে ফেলে। কয়েন বিক্রি করে একটি লভ্যাংশ কোম্পানিকে দিতে চায়। সরল বিশ্বাসে স্যার ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা ও কোম্পানির ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের অনুমতি দেন। প্রতারণায় ১০ জন অংশ নিলেও সিআইডি চারজনকে শনাক্ত করতে পেরেছে।

যেভাবে ঘটনার শুরু
ঢাকার লাকসাম গ্রুপ অব কোম্পানির কথিত স্বত্বাধিকারী মাহাবুবুল আলম ২০১৫ সালের ১৫ আগস্ট বায়েজিদ গ্রুপের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে যান। সঙ্গে ছিল কথিত ১২ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি। আমেরিকান কোম্পানির কান্ট্রি ডিরেক্টর সেজে তোফাজ্জল হোসেন মোল্লা বায়েজিদ গ্রুপের চেয়ারম্যান আবু বক্কর চৌধুরীকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ মূল্যবান একটি ম্যাগনেটিক কয়েন তাদের সংগ্রহে আছে বলে জানান। এই কয়েন আমেরিকান কোম্পানির কাছে বিক্রির কথাবার্তা চূড়ান্ত হলেও নিয়মিত কর পরিশোধকারী এবং ডলার লেনদেনকারী একটি বৈধ ব্যাংক হিসাবের সংস্থান না হওয়ায় প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না বলে প্রতারকরা শিল্পপতিকে জানায়।  আমেরিকা থেকে ম্যাগনেটিক কয়েন বিক্রির কয়েকশ কোটি টাকার ডলার আনতে বায়েজিদ ষ্টিল লিমিটেডের ব্যাংক হিসাবটি ব্যবহার করতে চান তারা। ডলার ব্যাংক হিসাবে জমা হলে একসঙ্গে টাকা ফেরত নেওয়া হবে না; পাবেন লভ্যাংশও। ব্যবসায় বিনিয়োগ করে লাভবানও হতে পারবেন– প্রতারকদের তরফে এসব প্রলোভনও দেখানো হয়।
এক পর্যায়ে কথিত প্রকৌশলী নুরুল আমিনকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং কথিত শিল্পপতি মাহবুবুল আলম তুহিন ও হাসানকে দুই কোটি টাকা নগদ তুলে দেন আবু বক্কর। টাকা নেওয়ার পর ফোন করলে সব প্রতারকের ফোন বন্ধ পান শিল্পপতি। এর পরই প্রতারণার বিষয়টি টের পান তিনি।

আরও পড়ুন

×