আসন পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদ
ভাঙ্গায় থানা ও উপজেলা পরিষদে ভাঙচুর-আগুন
৩২ গাড়ি ভাঙচুর ও পাঁচ মোটরসাইকেলে আগুন
ফরিদপুরে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদে এবং পুরোনো সীমানা বহালের দাবিতে ডাকা মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি সোমবার সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙ্গা থানা ও উপজেলা পরিষদ ভবনে হামলা-ভাঙচুর করে - সমকাল
ফরিদপুর অফিস ও ভাঙ্গা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:১০
সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদ ও পুরোনো সীমানা বহালের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা। সহিংস রূপ নিয়েছে অবরোধ কর্মসূচি। গতকাল সোমবার দুপুরে থানা, উপজেলা পরিষদ ভবন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় ও অফিসার্স ক্লাবে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করেছে আন্দোলনকারীরা। প্রায় ৪০টি গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের ছোড়া ইটপাটকেলে আহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েক সদস্য। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও ছবি সংগ্রহকালে সাংবাদিকদের ওপরও চড়াও হয় আন্দোলনকারীরা। এ সময় কুপিয়ে জখম করা হয় এক সাংবাদিককে। আহত হয়েছেন আরও কয়েক গণমাধ্যমকর্মী।
গত ৪ সেপ্টেম্বর গেজেটের মাধ্যমে ৩০০ আসনের সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ও হামিরদী ইউনিয়নকে ফরিদপুর-৪ আসন থেকে আলাদা করে ফরিদপুর-২ আসনে যুক্ত করা হয়েছে। এরপর থেকে ভাঙ্গায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে স্থানীয় বাসিন্দারা। গত রোববার থেকে তিন দিনের সকাল-সন্ধ্যা সড়ক ও রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি শুরু করে তারা।
ভাঙ্গায় বিক্ষোভ-অবরোধে আইনশৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটায় রোববার রাতে ৯০ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত পরিচয় ১৫০ জনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। মামলার ১ নম্বর আসামি আন্দোলন ঘিরে গঠিত ‘সর্বদলীয় ঐক্য পরিষদের’ প্রধান সমন্বয়ক ও আলগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ম ম সিদ্দিক মিয়া। শনিবার গভীর রাতে নগরকান্দা থানার চাঁদহাট ইউনিয়ন থেকে তাঁকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাঁকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ছাড়া রোববার রাতে সমন্বয়কদের একজন তৌহিদুল ইসলাম বুলবুলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তিনিও ওই মামলার আসামি।
এদিকে রোববার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভাঙ্গায় অবরোধ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘রাস্তা ব্লক করার অধিকার কারও নেই। এতে লাখ লাখ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। এটা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এমন বক্তব্য এবং মামলা ও সিদ্দিক মিয়াসহ দু’জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে আন্দোলনকারীরা। তারা সোমবার সকাল থেকে দ্বিতীয় দিনের মতো অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেন। এদিকে সকাল থেকেই সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন মোতায়েন করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণে বেলা ১১টার দিকে ঢাকা-বরিশাল ও ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের দুটি পাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছিলেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সাড়ে ১১টার দিকে হামিরদী ও আলগী ইউনিয়নের কয়েক হাজার গ্রামবাসী লাঠিসোটা, দাসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সড়কে নেমে আসেন। তারা ফরিদপুর-ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়কের ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, ফরিদপুর-খুলনা মহাসড়কের সূয়াদী ও মুনসুরাবাদ বাসস্ট্যান্ড, ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের হামিরদী ইউনিয়নের পুখুরিয়া ও মাধবপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান নেন। এ সময় সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে, টায়ার জ্বালিয়ে ও বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে বিক্ষোভ মিছিল করছিলেন আন্দোলনকারীরা। এতে ফরিদপুর-ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়কের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধা দিলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়। দুপুর ১২টার দিকে ভাঙ্গার অন্যান্য ইউনিয়ন থেকেও হাজারো মানুষ লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র হাতে মিছিল করে মহাসড়কে অবস্থান নেন। ক্রমেই পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এবং একপর্যায়ে তোপের মুখে পিছু হটে সড়ক থেকে সরে দাঁড়ান।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার মানুষ লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জড়ো হন। ভাঙ্গা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মসজিদের সামনে এপিবিএন ও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালান তারা। এ সময় ১০ থেকে ১২ আর্মড পুলিশ সদস্য দৌড়ে মসজিদে আশ্রয় নেন। উত্তেজিত জনতার ইটপাটকেলে রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড়াতে দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের। এক পর্যায়ে মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও মসজিদের লোকজন অবস্থান নিয়ে তাদের রক্ষা করেন। সেখান থেকে ফিরে দুপুর পৌনে ১টার দিকে ভাঙ্গা থানা, হাইওয়ে থানা, উপজেলা পরিষদ, নির্বাচন কার্যালয় ও পৌরসভায় হামলা চালান আন্দোলনকারীরা।
একই সময়ে আরও কয়েক হাজার মানুষ দেশীয় অস্ত্র হাতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে ঢোকে। এর পর পরিষদের হলকক্ষ, নির্বাচন কার্যালয়, ইউএনওর কার্যালয়, অফিসার্স ক্লাবে ভাঙচুর ও অগিসংযোগ করে তারা। আন্দোলনকারীরা ভাঙ্গা থানার মধ্যে পুলিশের ছয়-সাতটি গাড়ি ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। ভাঙ্গা হাইওয়ে থানায়ও তিন-চারটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় নির্বাচন কার্যালয়ের সামনে রাখা পাঁচ-ছয়টি মোটরসাইকেল। উপজেলা পরিষদের হল কক্ষের গ্লাস ও চেয়ার তছনছ করা হয়। পরে নির্বাচন ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। হামলা, ভাঙচুরের ছবি ও ভিডিও ধারণ করার সময় মাইটিভির সাংবাদিক সারোয়ার হোসেনকে কুপিয়ে জখম করে কয়েকজন। এ সময় আরও কয়েক সাংবাদিকও আহত হন। এ সময় তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে ৫টার পর থেকে আন্দোলনকারীরা মহাসড়ক ছেড়ে যান। তারপর থেকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে যা জানা গেল
পুলিশ ও উপজেলা পরিষদ সূত্র থেকে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে জানা যায়, ভাঙ্গা থানার তিনটি গাড়ি ও হাইওয়ে থানায় একটি অ্যাম্বুলেন্স, রেকার, জলকামানসহ আটটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। মামলায় জব্দ করা একটি প্রাইভেটকারে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। হাইওয়ে থানা পুলিশের ব্যবহৃত ও জব্দ করা ১৭টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে আন্দোলনকারীরা। এদিকে উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় ও পরিষদ হল কক্ষের সব আসবাব, নির্বাচন কার্যালয়ের সামনে থাকা চারটি মোটরসাইকেল আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে পরিষদ কার্যালয়ে থাকা চারটি মোটরসাইকেল।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ভাঙ্গা থানার ওসি আশরাফ হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভাঙ্গা) সার্কেল আসিফ ইকবাল কিংবা ইউএনও মিজানুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সন্ধ্যার পর ভাঙা থানা পরিদর্শনে যান পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।
জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান মোল্যা বলেন, আমরা বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করছি। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে দ্রুত প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য। এ বিষয়ে দ্রুত প্রতিবেদন পাঠালে আশা করছি দু-এক দিনের মধ্যে সমাধান হবে।
বাগেরহাটে হরতাল প্রত্যাহার
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বাগেরহাটে চারটি সংসদীয় আসন বহাল রাখার দাবিতে চলমান কর্মসূচির অংশ হিসেবে পূর্বঘোষিত মঙ্গল ও বুধবারের অর্ধদিবস হরতাল প্রত্যাহার করেছে সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটি। এর পরিবর্তে জেলা ও সব উপজেলায় অর্ধদিবস নির্বাচন কার্যালয়ের সামনে ওই দুদিন অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসব উপলক্ষে তাদের কেনাকাটা ও আনন্দ-উৎসবে যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটির কো-কনভেনর ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এম এ সালাম এই ঘোষণা দেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে রোববার অবস্থান কর্মসূচি, সোমবার সকাল-সন্ধ্যা এবং মঙ্গল ও বুধবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হরতাল পালনের ঘোষণা দিয়েছিল সর্বদলীয় সম্মিলিত কমিটি।
- বিষয় :
- সীমানা পুনর্বিন্যাস
