বসতভিটা বিক্রি না করায় বেড়া চারপাশে, গৃহবন্দি মা-ছেলে
বাড়ির চারপাশে বেড়া দিয়েছে প্রতিবেশী। মই বেয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকছেন ভুক্তভোগী শামসুন্নাহার। বৃহস্পতিবার তোলা ছবি সমকাল
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৮
মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি বানিয়ে জীবনযাপন করছেন স্বামীহারা শামসুন্নাহার বেগম। পোশাক কারখানায় কর্মরত একমাত্র ছেলে সাইফুল ইসলাম দীপুর উপার্জনে ভালোই চলছিল শামুসন্নাহারের সংসার। হঠাৎ করেই তার সাড়ে ৩ শতাংশ জমির ওপর লোলুপ দৃষ্টি পড়ে প্রতিবেশী নূরুল হুদার।
নামমাত্র দামে জমিটি কিনে নিতে উঠে পড়ে লাগেন নূরুল হুদা। কিন্তু প্রয়াত স্বামীর কেনা জমি শামসুন্নাহার বিক্রি করবেন না বলে নূরুল হুদাকে জানিয়ে দেওয়ার পর থেকে শুরু হয় অত্যাচার। ওই বাড়ির চার দিকেই নূরুল হুদার জমি। নিজের জমিতে বাঁশ কাঠ ও তারের বেড়া দিয়ে সব পথ বন্ধ করে দেন। গৃহবন্দি হয়ে পড়েন শামসুন্নাহার ও দীপু। গত ৯ মাস ধরে শামসুন্নাহারকে বের হতে দিচ্ছেন না নূরুল হুদা। এই ঘটনা ঘটেছে গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কেওয়া পূর্বখণ্ড গ্রামে।
মই বেয়ে বাড়ির বাইরে বের হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন শামসুন্নাহার। কিন্তু কেউ তাঁকে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেননি বলে অভিযোগের সুরে বললেন তিনি।
কেওয়া পূর্বখণ্ড এলাকার মফিজ উদ্দিনের ছেলে নূরুল হুদা এতটাই প্রভাবশালী যে, তাঁর সামনে গিয়ে কথা বলারও যেন সাহস নেই কারও। তাঁর প্রমাণ পেলেন সংবাদকর্মীরাও। ৯ মাস ধরে গৃহবন্দি শামসুন্নাহারের করুণ অবস্থা দেখতে যাওয়ার পর খবর পেয়ে সাংবাদিকদের দিকে তেড়ে আসেন নূরুল হুদা। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন।
শামসুন্নাহার বলেন, ৫ বছর আগে মারা গেছেন তাঁর স্বামী আমিরুল ইসলাম। ২০০৫ সালে জমি কিনে বাড়ি করেন তারা। সেখানেই জীবনযাপন করছিলেন। বাড়ির চারদিকে বেড়া দিয়ে তাদের গৃহবন্দি করে রেখেছেন নূরুল হুদা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য এক ইঞ্চি জায়গাও নেই। বিশেষ কোনো দরকারে মই বেয়ে দেয়াল টপকে বাইরে বের হতে হয়, কিন্তু তা নিরাপদ না। তেড়ে আসেন নূরুল হুদা। ভুক্তভোগী বলেন, ‘গত ৯ মাসের একটি রাতও ঘুমাতে পারি নাই। বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলছেন। না গেলে বুলডোজার দিয়ে বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেবেন বলেও হুমকি দিচ্ছেন। এ জমি নুরুল হুদা নিজে নিতে চান ব্যাপারটা এমন নয়, কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তিকে জমি কিনে দিচ্ছেন। বাড়ির চারপাশের সব জমি কিনে দেওয়া হয়ে গেছে। এখন শুধু আমার জমিই বাকি।’
শামসুন্নাহার বলেন, ‘গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করতাম। বাধ্য হয়ে সেগুলো বিক্রি করে ফেলেছি। সম্প্রতি নূরুল হুদা হুমকির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে ভয়ে দেয়াল টপকেও বের হই না। ঘরে চাল, ডাল, তেল, নুন কিছুই নেই। অনাহারে কাটছে আমাদের দিনগুলো।’ তাঁর প্রশ্ন, নূরুল হুদার দাপটের কাছে কি রাষ্ট্রও অসহায়?
সাইফুল ইসলাম দীপু বলেন, ‘এত অমানবিক মানুষ হতে পারে কী করে! ৯ মাস ধরে মা-ছেলেকে ঘরবন্দি করে রেখেছে। বাড়িছাড়া করতে কয়েকবার মাকে মারা হয়েছে। কিন্তু মা বাবার বসতভিটা ছেড়ে যাবেন না। প্রায় ২০ বছর আগে বাবা সাড়ে ৩ শতাংশ জমি কিনেছিলেন। জমির দাম বেড়ে গেছে। আমি এখন কারখানায় কাজেও যেতে পারি না। উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে। বসতবাড়ির চারপাশে বেড়া। মই দিয়ে খুবই কষ্টে যাতায়াত করি। মার খুবই কষ্ট হয়। জমি ছেড়ে দিতে প্রতিদিন হুমকি দিচ্ছে। মা অসুস্থ হয়ে গেছেন।’
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিধবা শামসুন্নাহারের বাড়ির চারপাশে কাঠ ও বাঁশের বেড়া। বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য এক ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা নেই। বাধ্য হয়ে মই বেয়ে বাড়ির পেছন দিয়ে যাতায়াত করছেন মা ও ছেলে।
অভিযুক্ত নূরুল হুদা বলেন, ‘আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য নই। আমি তাদের রাস্তা দেব না, দেখি কে রাস্তা দেয়। সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার কোনো কথা নেই।’
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ব্যারিস্টার সজীব আহমেদ সমকালকে জানান, এর আগে একবার নূরুল হুদাকে নোটিশ করা হয়েছে; সাড়া দেননি। দ্বিতীয়বার নোটিশ করেছেন। আগামী সোমবার তাঁকে ডাকা হয়েছে। যদি এতেও সাড়া না দেন, নিয়মানুযীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- বাড়ি জব্দ
