হাট-বাজার ইজারা না হওয়ায় রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
জুড়ী উপজেলার কামিনীগঞ্জ বাজারে সাপ্তাহিক পশুর হাট -সমকাল
জুড়ী (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৫
জুড়ী উপজেলার ছোট-বড় চারটি হাট ও বাজার ইজারা না হওয়ার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে সরকার। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরসহ দুই বছর ইজারায় না থাকায় সরকার বছরে প্রায় ৭৯ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
সূত্র জানায়, উপজেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী কামিনীগঞ্জ বাজার ও সীমান্তবর্তী ফুলতলা হাটবাজার দুটি প্রতি বছর সরকার থেকে ইজারা দেওয়া হয়। বিগত দুই বছর (বাংলা ১৪৩১-৩২) থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ইজারা না নেওয়ার কারণে খাস কালেকশনের মাধ্যমে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এতে করে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম টাকা আদায় হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, খামখেয়ালি ও তদারকির অভাবে ইচ্ছামাফিক কালেকশনের ফলে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সর্বশেষ ১৪৩০ বাংলা সনে কামিনীগঞ্জ হাটবাজার ৬৯ লাখ ৯১৯ টাকা ইজারা মূল্যে সরকার থেকে ইজারা দেওয়া হয় আতিকুর রহমান নামে এক ইজারাদারকে। ২৫ শতাংশ ভ্যাট, ট্যাক্সসহ দরপত্রকারী মোট ৮৬ লাখ ২৬ হাজার ১৪৮ টাকা ৭৫ পয়সা প্রদান করে বাজার এক বছরের জন্য ইজারা নেন।
পরবর্তী বছরে নির্ধারিত সময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কেউ দরপত্র ক্রয় করেননি। বাংলা ১৪৩১ সনে খাস কালেকশন হয়েছে ৫০ লাখ ৩৩ হাজার ৩৫৯ টাকা। বছরে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৮৯ টাকা ৭৫ পয়সা।
সর্বশেষ ১৪৩২ বাংলা সনেও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে হাটবাজার ইজারার দরপত্র আহবান করা হলেও সরকার নির্ধারিত মূল্যে কেউ দরপত্র ক্রয় না করায় খাস কালেকশন চলমান রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কামিনীগঞ্জ হাটবাজার ইজারা না হওয়ায় সরকার এক বছরে রাজস্ব হারিয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। চলতি বছর ও বিগত দুই বছরের মতো অনেক কম রাজস্ব আদায় হবে এবারও। এমনটাই আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
ফুলতলা হাটবাজার সর্বশেষ ১৪২৯ সনে জেলা প্রশাসক কর্তৃক দরপত্র নিলামের মাধ্যমে ৪৩ লাখ ২৯ হাজার ৫৯৯ টাকা ইজারা দেওয়া হয়। ২৫ শতাংশ ভ্যাট, ট্যাক্সসহ দরপত্র প্রদানকারী ৫৪ লাখ ১১ হাজার ৯৯৮ টাকা ৭৫ পয়সা দিয়ে এক বছরের জন্য ইজারা নেন। এরপর থেকে আর কেউ নিলামে অংশগ্রহণ করেননি। নিলামে না যাওয়ার কারণে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাধ্যমে সাপ্তাহিক খাস সংগ্রহ চলমান রয়েছে।
বাংলা ১৪৩১ সনে খাস কালেকশন হয়েছে ১১ লাখ ১২ হাজার ৪২০ টাকা। সরকার নির্ধারিত ব্যক্তির মাধ্যমে খাস কালেকশন হওয়ার কারণে এক বছরেই এই বাজার থেকে সরকার প্রায় ৪৩ লাখ টাকা রাজস্ব হারিয়েছে। দুই বাজার মিলে বছরে প্রায় ৭৯ লাখ টাকার রাজস্ব লোকসানে সরকার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গরু ব্যবসায়ী বলেন, কামিনীগঞ্জ বাজার থেকে প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় এক মাসে ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা আদায় হয়ে থাকে। এ বাজার জেলার মধ্যে একটি লাভজনক হাট। ব্যক্তি পর্যায়ে কেউ ইজারা নিলে তদারকি থাকার কারণে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি টাকা আয় হয়। এটি বাজারের চলমান লাভজনক প্রক্রিয়া। তবে সরকারিভাবে কালেকশন করলে ইচ্ছেমতো দাম বসানো হয়, কেউ কম দিলেও কোনো সমস্যা হয় না। এ কারণে কালেকশন কম হয়।
অন্যান্য হাটবাজারের মধ্যে গোয়ালবাড়ী হাটবাজার বাংলা ১৪৩২ সনে ইজারা মূল্য মাত্র ১ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং শাহগঞ্জবাজার ও ভৈরবগঞ্জবাজার ইজারা না হওয়ার কারণে খাস কালেকশনে বছরে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা হয়ে থাকে।
কামিনীগঞ্জ বাজারের সর্বশেষ ইজারাদার আতিকুর রহমান বলেন, সরকারি বাজার মূল্য একটু বেশি হওয়ায় লাভ হয় না। এ জন্য তারা নিলামে অংশ নেননি।
জুড়ী সদর ইউপি চেয়ারম্যান মাছুম রেজা বলেন, সরকার নির্ধারিত বাজারে হাট না বসে কোরবানির ঈদে যত্রতত্র অবৈধভাবে বাজার বসার কারণে কামিনীগঞ্জ বাজার নিলামে মহালদাররা অংশগ্রহণ করছেন না। প্রশাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ বাজার থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব হবে।
খাস কালেকশনের দায়িত্বে থাকা ফুলতলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার রাকিবুল হাসান জানান, সীমান্তবর্তী ফুলতলা বাজার এক সময় জমজমাট ছিল। বর্তমানে বাজারে লোক সমাগম কম। তবুও চলতি বছর রাজস্ব আদায় গতবারের চেয়ে বেশি আদায় হওয়ার আশা রয়েছে।
জায়ফরনগর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার আব্দুল হান্নান জানান, কামিনীগঞ্জ বাজার ইজারা না হওয়ায় আমরা খাস কালেকশন করে যাচ্ছি। এবার রাজস্ব আদায় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজস্ব আদায় যাতে বেশি করা যায় এজন্য বাজারে ব্যাপক তদারকি করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাবলু সূত্রধর সমকালকে জানান, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে ইজারাদাররা নিলাম নিতে চাইলে দেওয়া সম্ভব না। খাস কালেকশনে গতবারের চেয়ে বেশি টাকা রাজস্ব আদায় করতে বাজার মনিটরিং চলছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারের হাটে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা জানান, সঠিক ইজারা না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না। বৃষ্টির কারণে পশু নিয়ে আসা বিক্রেতাদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। পশু বেচাকেনাও কম। তবে হাট ব্যবস্থাপকরা জানান, বিক্রেতাদের প্রতি নজর দেওয়া হচ্ছে।
- বিষয় :
- হাট-বাজার
