পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে পর্যটন দাঁড়ায়নি
সংকটাপন্ন বালিয়াড়ির ওপর নির্মিত হয়েছে হোটেল। সরাসরি সেখান থেকে পয়োবর্জ্য যাচ্ছে সাগরে। সম্প্রতি কক্সবাজারের দরিয়ানগর এলাকায় -সমকাল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৭
দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, নয়নাভিরাম পাহাড়-সাগর মিলন, অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য– সবই আছে কক্সবাজারে। বছরে প্রায় এক কোটি স্থানীয় পর্যটক যান সমুদ্র শহরটিতে। নেই শুধু বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা। নানা অবহেলা, অব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতায় পর্যটন নগরীর সুবিধা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস হয়েছে কিন্তু পর্যটনকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় দাঁড় করা যায়নি এত বছরেও।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এক গন্তব্যে সাগর-পাহাড়ের এই মেলবন্ধন বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের অবারিত সুযোগ থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর সমন্বয় এবং পর্যটকবান্ধব পরিবেশ না থাকায় সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রধানতম এই পর্যটন এলাকায় দরকার আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ, সেবা প্রদানের সংস্কৃতি ও নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা। এখানে এসব অনেকটাই অনুপস্থিত।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, কক্সবাজারে পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকার কাজ করে
যাচ্ছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে সেগুলো মানুষ দেখতে পাবেন।
পাহাড় কেটে হোটেল, বিপর্যস্ত পরিবেশ
পাহাড়-সমুদ্র আর নদী-বনের মেলবন্ধনে কক্সবাজার। কিন্তু একের পর এক পাহাড় কাটা পড়েছে, গড়ে উঠেছে অন্তত পাঁচশ হোটেল-মোটেল। তবে এত কিছুর পরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি পর্যটন। মাঝখান থেকে ক্ষতি হয়েছে মাটি, মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের। পরিবেশের ক্ষতি করে এমন জীবিকা পৃথিবীজুড়ে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আশার আলো দেখাচ্ছে পরিবেশবান্ধব (ইকো) পর্যটন।
পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ইতোমধ্যে এই জেলায় গড়ে উঠেছে অন্তত ১০টি ইকো রিসোর্ট। এগুলো সাধারণত শহরের বাইরে। গ্রামীণ পরিবেশে বাঁশ, কাঠ ও শন দিয়ে তৈরি। বর্জ্য খাল বা সমুদ্রে ফেলা হয় না।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক জমির উদ্দিন বলেন, কক্সবাজার পর্যটন এলাকা হওয়ায় যত্রতত্র দালানকোঠা নির্মাণ হচ্ছে, বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ। ফলে ইকো রিসোর্ট নির্মাণ প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
থমকে আছে ট্যুরিজম পার্ক বাস্তবায়ন
দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে ২০১৬ সালে কক্সবাজারে প্রায় ১১ হাজার একর জমিতে তিনটি ট্যুরিজম পার্ক করার উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। কিন্তু ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পগুলো শেষ হবে তা নিয়েও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
টেকনাফ ও মহেশখালী উপজেলায় সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক ৯৬৭ একর, নাফ ট্যুরিজম পার্ক ২৭১ একর এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক ৯ হাজার ৪৬৭ একর জমিতে নির্মাণের কথা ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার সোনাদিয়া পার্ক প্রকল্প বাতিল করেছে।
পর্যটন নগরীতে নেই শিশু পার্ক
পর্যটক টানতে যেখানে সব রকমের বিনোদন কেন্দ্র থাকার কথা, সেখানে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে শিশু পার্কই নেই। ২০০০ সালে সমুদ্রসৈকতের ডায়াবেটিস পয়েন্টে শিশু পার্ক নির্মাণের জন্য কক্সবাজার পৌরসভাকে মৌখিক অনুমতি দেয় জেলা প্রশাসন। এরপর শিশু পার্ক নির্মাণের সাইনবোর্ড টানানো হয়। নির্মাণ করা হয় শিশুদের জন্য আটটি রাইড। কিন্তু জেলা প্রশাসনের লিখিত অনুমোদন না পাওয়ায় পার্কটি পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিশু পার্ক তো হয়ইনি, উল্টো জমি বেদখল হয়ে গেছে। সেখানে এখন ঝুলছে বিএম শাহীন কলেজের সাইনবোর্ড।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে আশার আলো
পর্যটন নিয়ে নানা হতাশার মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ২ অক্টোবর শুরু হবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট।
সাগরের বুকে দেশের সবচেয়ে লম্বা ও সর্বাধুনিক রানওয়ে, নাইট ল্যান্ডিং সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনালের মাধ্যমে এটি হয়ে উঠতে যাচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের আকাশপথের দরজা।
পর্যটন ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে আমূল পরিবর্তন আসবে এবং স্থানীয় সব ব্যবসায়ী এর সুফল ভোগ করবেন। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হওয়া নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে একটি আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবে। শুধু স্থানীয় পর্যায়ে নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বরিশালে পর্যটন: আট বছরে একটি সাইনবোর্ড
বরিশাল ব্যুরো জানায়, বরিশাল নগরীতে পর্যটন করপোরেশনের একটি পাঁচ তারকা মানের পর্যটন মোটেল ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। প্রস্তাবিত জমিতে সীমানা প্রাচীর তুলে লাগানো হয়েছে সাইনবোর্ড। আট বছরে দৃশ্যমান অগ্রগতি এটুকুই।
প্রকল্প এখনও একনেক পর্যন্ত পৌঁছায়নি। অর্থ কোন খাত থেকে আসবে– এটিরও সুরাহা হয়নি। ফলে এ প্রকল্প যে সহসা আলোর মুখ দেখছে না, তা অনেকটা নিশ্চিত।
উপকূলীয় এলাকায় হওয়ায় সাগর-নদী ঘিরে পুরো দক্ষিণাঞ্চলে পর্যটন বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনাও রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটাসহ বিভাগের পাঁচ জেলায় যাতায়াতের ট্রানজিট শহর বরিশাল। যে কারণে এখানে তারকা মানের হোটেল খুবই প্রয়োজনীয়।
পর্যটন করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতার হোসেন জানান, অবকাঠামো নির্মাণে প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুমোদন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে। অর্থায়নের জন্য দাতারাষ্ট্র খোঁজা হচ্ছে।
প্রকল্পটির দেখভাল করেন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা, পরিসংখ্যান ও প্রশিক্ষণ) জিয়াউল হক হাওলাদার। তিনি জানান, প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের সবুজ পাতাভুক্ত হয়েছে। এর ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হলো। পরবর্তী ধাপগুলো পেরিয়ে একনেকে অনুমোদিত হতে হবে।
- বিষয় :
- পর্যটন
