আটক চার ট্রলার তড়িঘড়ি নিলামে বিক্রি নিয়ে প্রশ্ন
বরিশালের বাবুগঞ্জে নিলামের জন্য আনা ট্রলার। বুধবার উপজেলার রাজগুরু খেয়াঘাটে সমকাল
বাবুগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৫ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বরিশালের বাবুগঞ্জে নদীতে অভিযানে নেমেছিল প্রশাসনের একটি দল। বুধবার দুপুরে তারা রহমতপুর ইউনিয়ন দোয়ারিকা এলাকা থেকে চারটি ট্রলার জব্দ করে। পরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তড়িঘড়ি করে নিলামে সেগুলো মাত্র ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। অথচ এসব ট্রলারের দাম অন্তত আড়াই-তিন লাখ টাকা। সেগুলো নিয়ে রাতেই মাছ শিকারে নামেন জেলেরা। অভিযোগ উঠেছে, বিএনপি নেতাদের উপস্থিতিতে একটি সিন্ডিকেটকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য সেগুলো এভাবে বিক্রি করেন উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা এ এফ এম নাজমুস সালেহীন।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, বুধবার দুপুর ১টার দিকে বাবুগঞ্জের রহমতপুর ইউনিয়নের দোয়ারিকা এলাকায় সুগন্ধা নদীতে জাল ফেলে মা ইলিশ শিকার করছিলেন অর্ধশতাধিক জেলে। খবর পেয়ে উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা পুলিশ নিয়ে সেখানে অভিযানে যান। এ সময় জেলেরা অভিযানের নৌযান লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। একপর্যায়ে তারা পালিয়ে গেলে ঘটনাস্থল থেকে জাল, মাছসহ চারটি ট্রলার আটক করা হয়।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এ এফ এম নাজমুস সালেহীন ট্রলারগুলো নিয়ে আসেন বাবুগঞ্জের রাজগুরু খেয়াঘাটে। তাঁর বাবুগঞ্জ থানা পুলিশের একটি দল থাকলেও তিনি ওই ট্রলারগুলো জব্দ করে থানায় পাঠাননি। উল্টো জরুরি ভিত্তিতে নিলাম ডেকে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বেলা সাড়ে ৩টায় রাজগুরু খেয়াঘাটে নিলামের আয়োজন করেন নাজমুস সালেহীন। তবে সেখানে ইউএনও বা কোনো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। রাজগুরু খেয়াঘাটের ইজারাদার আব্দুর রাজ্জাক মৃধাসহ পাঁচজন নিলামে অংশ নেন। সাজানো ওই নিলামে চারটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের দর প্রথমে ২৬ হাজার টাকা হাঁকেন ওলানকাঠী গ্রামের আব্দুল জলিল। পরে ২০০-৪০০ করে বাড়াতে বাড়াতে সর্বশেষ দর ওঠে ৩০ হাজার। সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মাত্র ৩০ হাজার টাকায় চারটি ট্রলার কিনে নেন ওলানকাঠী গ্রামের জামাল হাওলাদার।
জব্দ ট্রলারগুলোর মধ্যে দুটি পারভেজ হোসেনের, একটি করে ট্রলার জাকির হোসেন ও সজীব হাওলাদারের। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সন্ধ্যায়ই ট্রলার মালিকরা বাড়তি দাম দিয়ে জামাল হাওলাদারের কাছ থেকে ট্রলারগুলো কিনে নেন। সেগুলো দিয়ে রাতেই আবার নদীতে নামেন জেলেরা। এ বিষয়ে চারজন ট্রলার মালিকের মধ্যে দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় এক মৎস্যজীবীর ভাষ্য, ট্রলার নিলামে তোলার সংবাদ পেয়ে তারা গিয়ে দেখেন, সেখানে সব বিএনপি নেতাকর্মী। তিনি অংশ নিতে চাইলেও ভয়ে আর নাম লেখাননি। যে পাঁচজন নিলামে অংশ নিয়েছেন, তারা সাজানো লোক। প্রকৃত ক্রেতারা ভয়ে কেউ সামনে যাননি। এই ব্যক্তির ভাষ্য, চারটি ট্রলারের দাম অন্তত ৩ লাখ টাকা। একটি ইঞ্জিনের দামই ৩০ হাজার টাকার বেশি।
এক মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই সময়ে নদীতে জাল ফেললেই হাজার হাজার টাকা আসে। চারটি ট্রলার আটকা থাকলে মাছ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরাট লোকসান। তাই বিএনপি নেতাদের চাপে তাড়াহুড়া করে ট্রলারগুলো পানির দামে নিলামে বিক্রি হয়েছে।
উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুস সালেহীন বিএনপি নেতাদের চাপ বা অবৈধভাবে কাউকে সুযোগ দিতে নিলাম ডাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আটক নৌকা চারটি রাখার জায়গা না থাকায় সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ম অনুযায়ী স্পট নিলাম দেওয়া হয়েছে। উপস্থিত পাঁচজন দরদাতার মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতাকে নির্বাচিত করে বিক্রি করা হয়। ৩০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এখানে নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি।’ আটক ট্রলারগুলো পুলিশের হেফাজতে রেখে ২৫ অক্টোবরের পরে নিলামে দেওয়া যেত। অথবা জায়গার সংকট থাকলে ট্রলারগুলো নিয়ম অনুয়ায়ী স্পটেই ধ্বংস করা যেত কিনা, এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি এই মৎস্য কর্মকর্তা।
নিলামের পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বাবুগঞ্জ উপজেলা কমিটির সহসভাপতি ও রাকুদিয়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান তালেব। তিনি এর নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলছে। এর মধ্যে মাছধরা ট্রলার হাতেনাতে আটক করে সেটা আবার নিলামের মাধ্যমে অবমুক্ত করে দেওয়া হলো কোন যুক্তিতে, কার স্বার্থে? ২৫ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরে নিলামে তোলা হলে কী এমন ক্ষতি হতো? এতে তো অন্তত বাকি দিনগুলোতে নদীতে মা ইলিশ শিকারের অন্তত চারটি ট্রলার কম থাকত।’
বাবুগঞ্জের ইউএনও ফারুক আহমেদের ভাষ্য, তিনি ঘটনার সময় বরিশালে ছিলেন। আভিযানিক দলের ওপর অসাধু মৎস্যজীবীদের হামলার খবর ফোনে পেয়েছিলেন। চারটি ট্রলার আটকের কথা মৎস্য কর্মকর্তা তাঁকে জানান। সেগুলো রাখার জায়গা সংকটের কথা জানিয়ে স্পট নিলামের বিষয়টিও জানিয়েছিলেন। ইউএনও আরও বলেন, ‘কমবেশি কিছু টাকা তো সরকারি তহবিলে জমা হয়েছে। ট্রলার পাহারার দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না বলে তিনি (মৎস্য কর্মকর্তা) স্পট নিলাম দিয়েছেন। আমার জানামতে তিনি ভালো মানুষ। তবে প্রশ্ন যেহেতু উঠেছে, ভবিষ্যতে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। অন দ্য স্পটে আর নিলাম হবে না।’
- বিষয় :
- ট্রলার
