ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

‘ঔষধ চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’

‘ঔষধ চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’
×

নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লাগানো নোটিশ

মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার সদর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ঢুকতেই চোখে পড়ে একটি নোটিশ। সাদা কাগজে তাতে লেখা, ‘ঔষধ নাই। ঔষধ চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’।
সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অফিসের দরজায় লাগানো এমন নোটিশই বলে দিচ্ছে হাওর পারের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার চরম দুরবস্থার কথা। অন্তঃসত্ত্বা নারী থেকে শুরু করে জ্বর-সর্দিসহ সাধারণ রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবার ভরসাস্থল এসব কেন্দ্র। পরিবার পরিকল্পনার পরামর্শ ও সামগ্রীও পাওয়ার কথা এখানে। অথচ নাসিরনগরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অর্ধেকেরই দরজা বন্ধ, ঝুলছে তালা, ভেতরে জমে আছে নোংরা। বাকিগুলোয় নেই ওষুধ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। 

বছরজুড়ে বন্ধ থাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র
জানা গেছে, উপজেলায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে আটটি। কোনোটিতেই চার-পাঁচ বছর ধরে চিকিৎসক নেই। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন চিকিৎসকসহ পাঁচজন কর্মচারী থাকার কথা। বাস্তবে প্রায় সব পদই শূন্য। 
সূত্র জানায়, চাতলপাড়, বুড়িশ্বর ও ভলাকুট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন করে পরিদর্শিকা ছাড়া বাকি পদগুলো খালি। কুন্ডা কেন্দ্রে একজন নিরাপত্তা প্রহরী এবং গোয়ালনগর কেন্দ্রে একজন আয়া ছাড়া বাকি পদগুলো শূন্য। 

ধরমণ্ডল, চাপড়তলা, হরিপুর কেন্দ্রে কোনো পদেই জনবল নেই। দাপ্তরিকভাবেই সব পদ শূন্য দেখানো আছে। সম্প্রতি কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ভবনগুলোর প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। বারান্দায় দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছেন স্থানীয়রা। ভেতরে প্রস্রাবের দুর্গন্ধ আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু পরিত্যক্ত ভ্যানগাড়ি ও অটোরিকশা। 
ধরমণ্ডল গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণ দাস অপকটে বললেন, ‘কেন্দ্রডা মেলা দিন ধইরা বন্ধ। তাই আমরা এখানে পেসাব করি। শুধু আমি একলা না, বাজারের সবাই এখানে পেসাব করে।’
ধরমণ্ডল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিক মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ধরমণ্ডল স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। কবে এটা শেষ খোলা হয়েছে আমার জানা নেই। এটা বর্তমানে বাজারের গণশৌচাগার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

চাপড়তলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনসুর আহমেদ বলেন, আমাদের এলাকার মানুষকে চিকিৎসার জন্য পাশের উপজেলায় যেতে হয়। এই ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র দিনের পর দিন বন্ধ থাকে।
গোয়ালনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা আরমান মিয়া বলেন, একজন আয়া মাঝেমধ্যে কেন্দ্রটি খোলে বসে থাকেন। এখানে কোন চিকিৎসা দেওয়া হয় না। কুণ্ডা ইউনিয়নের বাসিন্দা রহমত চৌধুরী বলেন, কেন্দ্রের পাশেই আমার বাড়ি। গত পাঁচ মাসের মধ্যে এক দিনও এটা খোলা দেখিনি।
ধরমণ্ডল ইউনিয়ন কেন্দ্রের সামনে দেখা হয়, ধরমণ্ডল গ্রামের পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মরিয়ম বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আইছিলাম কিছু পরীক্ষা করাইতে। ডাক্তার তো দূরের কথা, আইয়া দেখি দরজার সামনে দোকান নিয়া বইসা আছে মানুষ। এহন আমরা চিকিৎসা কই করুম?’ 
চাপড়তলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চাপড়তলা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রবি মিয়া বলেন, ‘এক মাসে ছয়বার আইছি এই হাসপাতালে। একবারও লোকের দেখা পাইলাম না। আমরা গরিবরা কি চিকিৎসা পামু না? আমরার তো টাকা দিয়া ওষুধ কিনুম- এই ক্ষমতাও নাই।’

কর্তৃপক্ষের অসহায় স্বীকারোক্তি
নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা রেজিয়া আক্তার বলেন, ‘ছয় মাস ধরে সরকারি ২৩ ধরনের ওষুধ সরবরাহ বন্ধ। রোগীরা আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত। তাই বাধ্য হয়ে ‘ঔষধ নাই- ঔষধ চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’ নোটিশ লাগিয়েছি।’
চাতলপাড়ের পরিবার পরিকল্পনাকর্মী নাদিরা বেগম জানান, আগে তাদের কেন্দ্র থেকে সেবা নিতেন ৬ থেকে ৮ হাজার দম্পতি, এখন ওষুধ না থাকায় কার্যক্রম অনেকটা স্থবির। 
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. নূর আহমদ বলেন, উপজেলার কোনো ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোথাও ডেলিভারি ও ডিডিএস কিট নেই। রোগীদের আমরা শুধু পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। সাধারণ প্রসবের জন্য আসা রোগীরাই প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিবার পরিকল্পনা উপপরিচালক মোস্তফা কামাল গতকাল শুক্রবার সমকালকে বলেন, আমরা স্বীকার করতে বাধ্য, আমাদের অধিকাংশ কেন্দ্রেই জনবল সংকট। কয়েকটি কেন্দ্রে একজনও জনবল নেই। অন্য কেন্দ্রের লোক দিয়ে এগুলো সচল রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা হওয়ায় কেউ সেসব কেন্দ্রে যেতে চান না। তাই মাঝেমধ্যে সেগুলো বন্ধ থাকে। ছয় মাস ধরে সব কেন্দ্রে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে বলেও জানান তিনি। ‘ঔষধ নাই, ঔষধ চাহিয়া লজ্জা দিবেন না’ নোটিশটির বিষয়ে তিনি বলেন, ওষুধ সরবরাহ না থাকায় জনগণের তোপের মুখে আছি। তাই এটা লেখার আমাদের আনঅফিসিয়াল নির্দেশনা আছে।

নেই জনবল, নেই ওষুধ 
২০২৪ সালের শুরুতে পুরোনো প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও কয়েক মাস ধরে অপারেশন প্লান স্থগিত থাকায় মজুত ফুরিয়ে যায়। একটি নরমাল ডেলিভারি কিটে থাকে ১৭ ধরনের জরুরি ওষুধ ও সরঞ্জাম। ডিডিএস কিটে থাকে ২৫ ধরনের প্রয়োজনীয় ওষুধ। কিন্তু উপজেলার কোনো ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এগুলোর কিছুই নেই। ফলে সাধারণ অসুখে আক্রান্ত, পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহণে ইচ্ছুক নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে অন্তঃসত্ত্বা নারীরা পর্যন্ত ফিরছেন খালি হাতে।
আট কেন্দ্রে এক বছরে ১৫ ধরনের বড়ি প্রয়োজন ৭ লাখ ৭ হাজার ৫২০, দুই ধরনের ক্যাপসুল প্রয়োজন ৩৮ হাজার ৪০০ এবং চার ধরনের ৬ হাজার ২৪০ বোতলজাত ওষুধ প্রয়োজন। সরবরাহ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ ছয় মাস ধরে এসব ওষুধ পাচ্ছে না হাওড়ের প্রান্তিক জনসাধারণ।

আরও পড়ুন

×