পুষ্পকথা
খুলনায় অস্ট্রেলিয়ান জবা
সম্প্রতি ফোটা অস্ট্রেলিয়ান জবা ফুল লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। গাছপালা-পথঘাট সব ভিজে যাচ্ছে। আকাশ কালো করে রয়েছে জমাট মেঘেরা। বিকেলেই ঘনিয়ে এসেছে সাঁঝের আঁধার। বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ও ভাবিনি, শরতের শেষে এসে এমন বৃষ্টির পাল্লায় পড়ব। খুলনার গোয়ালখালীতে গাড়ি থেকে নেমে ছাতা মাথায় দিয়েই নেমে পড়লাম সিটি নার্সারিতে। কোনো লোকজন নেই। ভেতরে গাছপালা ও মাটির ওপর দিয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে যাচ্ছে। রাস্তা থেকেই ভেতরে একটা জবা ফুল দেখে দাঁড়াতে হলো। এত বড় হয় জবা ফুল!
জলকাদা মাড়িয়ে ভেজা গাছপালা সরিয়ে সেই জবা ফুলগাছটার কাছে যেতে থাকলাম। কোনটা রেখে কোনটা দেখি? আরও অনেক জাতের জবা ফুল ফুটে আছে। কোনোটার রং সরষে হলুদ, কোনোটা আবার পাটকেলে রং। কোনোটার পাপড়িতে আবার যেন ছড়িয়ে পড়েছে রংধনুর সাত রং। কোনো ফুলের পাঁচটি পাপড়ি এক সারিতে সাজানো, কোনো ফুলের পাপড়িগুলো অনেক স্তরে সাজানো। পাপড়ির এ বিন্যাসের কারণে এক সারির জবাকে বলে সিঙ্গেল জবা; বহু পাপড়ির জবাকে বলে ডাবল জবা। যে ফুলটা দেখার জন্য এত আগ্রহ, সেটি সিঙ্গেল জবা। এক স্তরে রয়েছে পাঁচটি ঢাউস আকারের তেরঙা পাপড়ি। পাপড়ির গোড়া থেকে রংগুলো ধীরে ধীরে একটার সঙ্গে একটা মিশে আছে। ফুলের কেন্দ্রের রং গাঢ় মেরুন, এরপর লাল, তারপর গোলাপি। পাপড়ির কিনারাটা আবার হলদে। মাঝখানে হলদে গুঁড়ামাখা খাটো পরাগদণ্ডগুলো যেন সে ফুলের বিজয়বার্তা ঘোষণা করছে। বৃষ্টির ফোঁটা মেখে আছে সারা পাপড়িতে। বড্ড স্নিগ্ধ আর লাবণ্যময়ী বর্ণিল সে রূপ!
আমরা সচরাচর যে টকটকে লাল রঙের জবা ফুল দেখি, এই জবা সে রকমের একরঙা নয়; বহুবর্ণা। আর আকারেও অনেক বড়। দুই বছর আগে আশুলিয়ায় চারাবাগে একটি নার্সারিতে এ রকম একটি জবা ফুলের ছবি তুলেছিলাম। সে ফুলের পাপড়ির বিস্তার ছিল সাড়ে আট ইঞ্চি, অনেকটা মাঝারি আকারের থালা বা প্লেটের মতো। এ ফুলটারও পাপড়ির বিস্তার হবে প্রায় সাত ইঞ্চি। নার্সারির লোকেরা সে জবাকে বলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান জাতের।
অস্ট্রেলিয়ান জবাগুলো হয় অনেক বড়, বর্ণিল, উজ্জ্বল ও বিচিত্রবর্ণা। গাঢ় ও হালকা রঙের মিশেলে ফুলগুলো বেশ চমৎকার লাগে। আমাদের দেশি জাতের বা ভারতীয় জাতের জবাগুলোর তুলনায় এ জবার গাছগুলো খাটো, পাতাও কিছুটা পুরু, হালকা সবুজ, পাতার কিনারা করাতের মতো খাঁজকাটা নয়। গাছ খাটো হওয়ায় যে কোনো বাগানে, ছাদে, টবে এ গাছ লাগানো যায়।
অস্ট্রেলিয়া এসব বিশেষ জাতের জবার আবাসস্থল; সে দেশেই উদ্ভিদবিদরা জবার নিত্যনতুন জাত উদ্ভাবন করে বিশ্বকে উপহার দিচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ায় হিবিস্কাস গণের ৪০ প্রজাতির জবাজাতীয় ফুল আছে, যার অধিকাংশই এখন সে দেশে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এই জবার উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Hibiscus × rosa-sinensis, বহুবর্ষী গুল্ম প্রকৃতির গাছ। এ প্রজাতির এ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৩০০টি জাতের কথা জানা গেছে। এগুলোর মধ্যে রাশিয়ান ফায়ারবার্ড, ড্রিম ব্লু অ্যান্ড ব্ল্যাক, কালার ক্রাশ, মুরিয়া সিলভার সান, ক্যারিবিয়ান র্যাগিং ফায়ার, টাইগার বেইট, ক্রিস লাক ইত্যাদি অন্যতম জাত। ছবির ফুলটিও একটি অস্ট্রেলিয়ান জাত, যা সম্প্রতি এ দেশে এসেছে। আরও জাতের অস্ট্রেলিয়ান জবাও এ দেশে আছে। প্রধানত তিন শ্রেণির জবার জাত এ দেশে আছে– দেশি, ভারতীয় ও অস্ট্রেলিয়ান জবা। এর সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বেগুনি ফুলের সিরিয়ান বা কোরিয়ান জবা, ছোট ছোট গোলাপি লাল ফুলের চায়নিজ জবা ও দুধসাদা ফুলের হাওয়াইয়ান জবা। এ দেশে ময়মনসিংহের এক জবা সংগ্রাহকের সংগ্রহে ছিল প্রায় দুইশ জাতের জবা! কবি নজরুল পার্কে লাগিয়েছিলাম ৬০ জাতের জবা। কিন্তু সঠিকভাবে সেসব জাতের শনাক্তকরণ না হওয়ায় বেনামে বা ভুল নামে জবা ফুলগুলো পুষ্পপ্রেমীদের কাছে পরিচিত হচ্ছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- ফুল চাষ
