‘এদ্দিন সবায় খালি আশা দিচে এইবার মনে হয় কাম হইবে’
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে মশাল মিছিল
তিস্তা নদীর লালমনিরহাট অংশের রেলসেতু পয়েন্টে বৃহস্পতিবারের মশাল মিছিল সমকাল
স্বপন চৌধুরী, রংপুর
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৫৯ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
তিস্তার পারে বসে রংপুরের গঙ্গাচড়ার পূর্ব ইচলি চরের আব্দুস সবুর বললেন, ‘এ পর্যন্ত ১০ বার নদীভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হচি। এ্যালা স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ আশ্রয়ণকেন্দ্রের বাসিন্দা হামরা। এদ্দিন সবায় খালি আশা দিচে, তিস্তার কাম করে নাই। এইবার মনে হয় কাম শুরু হইবে। এইবারের আন্দোলনে হামরা তিস্তাপারের সবায় আচি।’ শুক্রবার বিকেলে গঙ্গাচড়ায় তিস্তা সেতু এলাকার নদীপারে গিয়ে দেখা যায়, লোকজনের মুখে মুখে আগের দিনের মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচির আলোচনা। তারা আশায় বুক বাঁধছেন, এবার নদী শাসন হবে, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। সুদিন ফিরবে তিস্তাপারের মানুষের।
বহু বছর ধরে বৃহত্তর রংপুরের তিস্তাপারের বাসিন্দারা শুধু আশ্বাস পেয়েছেন, সমাধান পাননি। বারবার আশায় বুক বাঁধেন নদীপারের মানুষ, তবু দুর্গতি তাদের পিছু ছাড়ে না। খরায় শুকিয়ে মরেন, বন্যায় ভেসে যান। ভাঙনে সব হারিয়ে ঠিকানা বদলাতে হয় প্রতি বছর। এবার তারা আর প্রতারণার শিকার হতে চান না। তারা চান, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হোক। এই দাবিতে নদীপারের মানুষ সোচ্চার। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোঘণা করে মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধমে তারা এর প্রমাণ দিয়েছেন।
এ কর্মসূচির পর নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ডাঙ্গারচরের আব্দুর রাজ্জাক। তিনি মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে তো আমাদের জীবনটা কেটে গেল। ছেলেমেয়েরা যাতে আমাদের মতো কষ্টে না ভোগে, সেজন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা দরকার। সবাই মিলে আন্দোলন জোরদার করলে সরকার দাবি পূরণ করতে বাধ্য হবে।’
লালমনিরহাটের আদিতমারীর গোবর্ধন চরের রবিউল ইসলাম বলেন, ‘নদীপারের মানুষ এবার জেগেছে। দাবি আদায় করেই ছাড়ব।’ নীলফামারীর ডিমলার তিস্তা ব্যারাজ এলাকার বাদশা মিয়া বলেন, ‘হামরা চাই ভোটের আগোত তিস্তার কাম শুরু হোক। না হইলে আর নদীপারের মানুষের ভাগ্য বদলাবার নয়।’ গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মিটারী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘এবার স্থানীয় মানুষজনের মাঝে একটি বিশ্বাস কাজ করছে, হয়তো সরকার মহাপরিকল্পনার কাজ করবে।’
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে নভেম্বর মাসেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছে তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন। দাবি আদায়ে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বৃহত্তর রংপুরের তিস্তা নদীবেষ্টিত লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার ১১টি পয়েন্টে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একযোগে মশাল প্রজ্বালন করা হয়। এর আগে ৫ অক্টোবর এসব জেলায় পদযাত্রা ও প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ৯ অক্টোবর উপজেলা পর্যায়ে গণমিছিল ও গণসমাবেশ করা হয়।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর তিস্তাপারের লালমনিরহাট অংশে কাকিনা ও রেলসেতু পয়েন্টে মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু। এ সময় তিনি বলেন, ‘তিস্তাপারের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য আমরা একের পর এক কর্মসূচি দিচ্ছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের এই কান্নাকে সরকার আমলে নেয়নি।’
- বিষয় :
- তিস্তা
