শাহ কৃষি জাদুঘর
যেখানে ছোঁয়া যায় কৃষির শিকড়
নওগাঁর মান্দা উপজেলার কালীগ্রামে ‘শাহ কৃষি তথ্য পাঠাগার ও কৃষি জাদুঘর’ -সমকাল
কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৮:১৩ | আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৯:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রত্যন্ত গ্রামে অসংখ্য গাছপালায় ঘেরা বিশাল এক বাড়ি। মূল প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে পড়ে কৃষি জাদুঘর, ডান দিকে পাঠাগার। জাদুঘরে ঢুকতেই দেখা মেলে দেয়ালের ওপরের দিকে টাঙানো বিভিন্ন আকারের মাথালের সারি। রয়েছে কৃষিকাজের নানান উপকরণ– লাঙল, জোয়াল, গরুর গাড়ির ছই, সেচের যন্ত্র, মাছ ধরার চাঁই-পলো, ফসল মাড়াইয়ের গাদন কাঠি, নিড়ানি, করাত; কী নেই সেখানে! পুরো ঘর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ঢঙের কৃষি উপকরণে ঠাসা। আর দেয়ালের একাংশজুড়ে রয়েছে কৃষিপঞ্জিকা, যাতে ১২ মাসের কৃষিকাজ, বীজ নির্বাচন, রোগবালাই দমন, আবহাওয়ার নির্দেশনা একসঙ্গে লেখা। সব মিলিয়ে জাদুঘরটি যেন কৃষি ও কৃষকের ইতিহাসের ভান্ডার।
বলছিলাম নওগাঁর মান্দা উপজেলার নিভৃত গ্রাম কালীগ্রামে অবস্থিত ‘শাহ কৃষি তথ্য পাঠাগার ও কৃষি জাদুঘর’-এর কথা। জেলা সদর থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মান্দা উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে এই গ্রাম। পৈতৃক ভিটায় প্রায় ২৭ বছর ধরে এই জাদুঘর ও পাঠাগার গড়ে তুলেছেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম শাহ। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে জাদুঘর। এখানে কৃষিবিষয়ক বই ও ম্যাগাজিন ছাড়াও বাস্তবজীবনে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সব বিষয়ের অনেক বই রয়েছে।
বিশাল এই উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম শাহ বলেন, ‘আমার শৈশব কেটেছে ধানের মাঠে, গোলার পাশে। লাঙল আর জোয়ালের সঙ্গেই বড় হয়েছি। কিন্তু আজকের প্রজন্ম জানে না, কৃষি কীভাবে আমাদের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছিল। আমি চেয়েছি, সেই ইতিহাসটুকু বাঁচিয়ে রাখতে। সেই চিন্তা থেকে ২০০৮ সালে শখের বশে কৃষিবিষয়ক বই সংগ্রহ শুরু করি। পরে নিজেদের তিন একর জমিতে গড়ে তুলি পাঠাগার। তারপর ধীরে ধীরে কৃষি উপকরণ, যন্ত্রপাতি ও কৃষকের ব্যবহার্য সামগ্রী জড়ো করি। আমি চাই, কৃষক যেন নিজের কাজে গর্ব অনুভব করেন। এই জাদুঘর তাদেরই গল্প বলে, যারা ঘাম ঝরিয়ে আমাদের আহার জোগান।’
পাঠাগার ঘুরে দেখা যায়, ভেতরে সাজানো সারি সারি কৃষিবিষয়ক বই, ম্যাগাজিন ও গবেষণাপত্র। এর মধ্যে রয়েছে মৎস্য চাষ, পশু পালন, ভেষজ ও কৃষির পাশাপাশি ভ্রমণ, গল্প, ধাঁধা ও চিত্রাঙ্কনের বই। এখানে প্রতিদিন স্থানীয় কৃষক, কৃষি বিষয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকরা এসে সময় কাটান। পাঠাগারের ভেতরে বসে পড়ার জন্য চেয়ার, চৌকি ও মোড়া রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমার ধানে পোকা ধরেছিল। এখানকার বই পড়ে বুঝেছি, কীভাবে ওষুধ দিতে হয়। আমাদের গ্রামের জন্য এই জায়গাটা এখন আশীর্বাদ।’
শাহ কৃষি জাদুঘরে ঘুরতে আসা মান্দার সতীহাট জিএস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিহা হোনে কৃপা বলে, ‘আমরা কৃষিপ্রযুক্তি পড়ি; কিন্তু অনেক পুরোনো যন্ত্র দেখিনি। এখানে এসে সেই ইতিহাস দেখা যায়। মনে হয়, বইয়ের বিষয়গুলো চোখের সামনে জীবন্ত।’
জাদুঘরের কেয়ারটেকার হজরত আলী জানান, দেশ-বিদেশ থেকেও এখানে মানুষ আসে। কেউ বই দেন, কেউ পুরোনো কৃষিযন্ত্র দান করে যান। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বেক্স স্টার করপোরেশনের পরিচালক ও কিডনি বিশেষজ্ঞ ড. স্টিভেন গেস্ট জাদুঘর পরিদর্শনে এসে বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের মাটির গন্ধমাখা ইতিহাস, যা যে কোনো দেশের জন্য অনুপ্রেরণার।’ পরের বছর জাপানের চিকিৎসক কাতাসু হিরো ইয়ামাশিতা ও তাঁর স্ত্রী সেইকো ইয়ামাশিতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মল্লিকা ব্যানার্জি ঘুরে গিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ হুমায়রা মণ্ডল বলেন, শাহ কৃষি জাদুঘর ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর গুরুত্ব জাতীয় পর্যায়ের। কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি যেমন অপরিহার্য, তেমনি কৃষির শিকড় জানা দরকার। এই জাদুঘর সেই শিকড়কে স্পর্শ করার সুযোগ দিচ্ছে।
