ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আজও ম্লান নতুন কুঁড়ির নন্দিতা

আজও ম্লান নতুন  কুঁড়ির নন্দিতা
×

মাধবপুরের বৈকুণ্ঠপুর বাগানে চা পাতা তোলায় ব্যস্ত নারী শ্রমিক সমকাল

মো. আইয়ূব খান, মাধবপুর (হবিগঞ্জ)

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাধবপুর উপজেলায় অবস্থিত ৫টি চা বাগানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। এই জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। তারা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন। এসব নারীর প্রায় ৭০ শতাংশ প্রতিদিন স্থানীয় চা বাগানগুলোতে কাজ করেন। আজ পর্যন্ত তারা বুঝে পাননি তাদের ন্যায্য অধিকার।  

প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস বলছে, এখানকার চা বাগানের নারী শ্রমিকদের হাত ধরেই এ শিল্পের এগিয়ে চলা। তাদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছোট ছোট প্রত্যাশা আজও অধরা। নারী হিসেবে যে ন্যূনতম অধিকার, সামাজিক মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বাগানের এই নারী শ্রমিকদের প্রাপ্য, তার অধিকাংশই মেলে না। কঠোর পরিশ্রমের পরও তাদের জীবনে আসেনি আর্থিক সচ্ছলতা কিংবা সামাজিক মর্যাদা। 
বাংলাদেশে মোট চা বাগানের সংখ্যা ২৪০টি (ফাঁড়ি বাগানসহ)। এর মধ্যে মূল বাগান রয়েছে ১৫৮টি। সারাদেশে কর্মরত চা শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে সিংহভাগই নারী। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা যায়, নারী-পুরুষের মজুরি এখন দৈনিক ১৭০ টাকা হলেও তিন ক্যাটেগরির বাগান রয়েছে। ফলে অনেক বাগানে নারী শ্রমিককে এখনও ন্যূনতম মজুরি ১২০ টাকা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক এবং বাগানের স্থায়ী শ্রমিকের মজুরি এক হওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয় না।

নারী চা শ্রমিকদের জীবন অবিরাম সংগ্রামের। পরিবারে অভাব, শিক্ষার সীমিত সুযোগ, বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে ছোটবেলা থেকেই তারা বাগানের মাঠে ঝুঁকে পড়েন চা পাতার ঝুড়ি হাতে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিরলস কাজ করলেও মজুরি খুবই সামান্য, যা দিয়ে পরিবারের তিনবেলা অন্নসংস্থান কঠিন হয়ে পড়ে।

নোয়াপাড়া চা বাগানের শেফালী রেলি বলেন, এই নারীদের জীবনে নেই কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বা মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা। বাগানে চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও তা অপ্রতুল। অন্তঃসত্ত্বা শ্রমিকদের জন্য নেই মাতৃত্বকালীন ছুটি বা আর্থিক সহায়তা। ফলে অনেক নারী গর্ভকালেও শ্রম দিতে বাধ্য হন।
বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের নারী শ্রমিক বিমলা চৌহান বলেন, চা বাগানের নারী শ্রমিকদের দিন শুরু হয় ভোর ৪টার আগে। ঘরে স্বামী-সন্তান ও বয়স্ক অভিভাবকদের দেখাশোনার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। ঘর সামলে আসেন বাগানে। কাজের চাপ থাকলে সকালেই মাঠে যেতে হয় তাদের। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেও বিশ্রাম মেলে না। এভাবেই কাটে প্রতিদিন।

জগদীশপুর চা বাগানের কমলা সাঁওতাল জানান, চা বাগানের নারীরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও তাদের শ্রমের মূল্যায়ন নেই। তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা উন্নয়ন কর্মসূচি। স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে এখানকার নারী চা শ্রমিক। অল্প মজুরি ও অপ্রতুল সুবিধার কারণে তারা দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারছেন না।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, এসব নারীর উন্নয়নে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পুষ্টিকর খাবার এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নারী শিক্ষার প্রসার ও বিকল্প কর্মসংস্থান করতে হবে।
ইউএনও জাহিদ বিন কাশেম বলেন, চা বাগানের নারী-পুরুষ সব শ্রমিকের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে নগদ টাকা, গরু-ছাগল, হাঁস, টিউবওয়েলসহ সরকারি বিভিন্ন অনুদান দেওয়া হচ্ছে। তাদের জীবনযাত্রা এখন আগের চেয়ে ভালো।

আরও পড়ুন

×