শহরে ভরাট, গ্রামে পুকুর খনন
বিল আরও গভীর করে কেটে তৈরি করা হয়েছে অবৈধ পুকুর। চলছে মাছ চাষ। গত রোববার রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার কাতলার বিল থেকে তোলা - সমকাল
সৌরভ হাবিব, রাজশাহী
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘ফলিয়ার বিলকে সবাই রাক্ষসী বিল বলত। বর্ষায় বারনই নদীসহ চারদিকের জোয়ারের সব পানি এই বিলে জমা হতো। বিলের মাঝখানের খাল দিয়ে সব পানি নেমে যেত দুর্গাপুরের হোজা ও তাহেরপুর নদীতে। তখন এই খালে ছোট-বড় দেশি মাছ আসত। কোনো জলাবদ্ধতা হতো না। এখন চারদিকে শুধু পুকুর। বর্ষা হলে জলাবদ্ধতায় ফসল ডুবে নষ্ট হচ্ছে।’ কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার পলাশপুর গ্রামের ফজলু মোল্লা। পেশায় তিনি ফলিয়ার বিলের পুকুর পাহারাদার।
ফজলু মোল্লার মতে, দুর্গাপুর উপজেলার গগনপাড়া থেকে পবা উপজেলার রামচন্দ্রপুর হয়ে নওহাটা পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার এলাকায় এই বিলে অন্তত ৩০০ পুকুর হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানান, জেলায় ৬৭টি বিল আছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই পুকুর খনন হয়েছে। এগুলো পুরোপুরি বদ্ধ হয়ে গেছে। ১০ শতাংশ বিল উন্মুক্ত। সেখানেও সমাজবদ্ধভাবে মাছ চাষ হচ্ছে। একেবারে মুক্ত জলাশয় নেই।
এর মধ্যে ফলিয়ার, যশের ও কান্তার বিল সরেজমিন ঘুরে দেখেছেন এ প্রতিবেদক। সরকারি হিসাবে গত এক দশকে বেড়েছে ১১ হাজার পুকুর। এতে সুফল স্বরূপ চাষযোগ্য মাছের উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে। জমির মালিকরা আগে এক বিঘা জমি ইজারা দিয়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পেতেন। এখন পাচ্ছেন ৮০ থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে শহরে। সেখানে গত ১১ বছরে ৮০০ পুকুর ভরাট করা হয়েছে।
ফলিয়ার বিলে যা দেখা গেল
বিলের পাশে খালের গর্তে জাল ফেলে মাছ ধরার চেষ্টা করছিলেন হানিফ সরদার। তিনি বলেন, ‘এই খালে এক খেওয়ে পাঁচ ধরা (২৫ কেজি) মাছও ধরেছি। এখন তো জাল ফেলার জায়গা নেই, সবখানে শুধু পুকুর! খালের মুখটাও পুকুরের পাড় করে বন্ধ করেছে। দেশি মাছ হারিয়ে গেছে।’
জেলে শাহার উদ্দিন মোল্লা এখন স্থানীয় আলম ডাক্তারের পুকুর পাহারা দেন। তিনি বলেন, এই বিলে প্রথমে পুকুর কেটেছেন রামচন্দ্রপুরের কুদরত। এরপর কেটেছেন দ্বীন মোহাম্মদ। তারা মারা গেছেন। খালের মুখে পুকুর কেটেছেন জসিম ও কছিমের ছেলেরা। এদের কেউ আওয়ামী লীগ করেন, কেউ বিএনপি।
দুর্গাপুরের লক্ষণখলসী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা ইমান আলী বলেন, ফলিয়ার বিলে তিন শতাধিক নতুন পুকুর হয়েছে। ১৯৭২ সালের পর ভূমি অফিসের জরিপ হয়নি। এগুলো রেকর্ডে নেই।
দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন বলেন, ফলিয়ার বিলে কতগুলো পুকুর হয়েছে, তা জানা নেই। খাল বন্ধ করার অভিযোগও কেউ করেনি। এটা কারা করেছে, খোঁজ নিয়ে জানব।
যশের বিলে ১০৫টি দিঘি
বাগমারা উপজেলার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম নিয়ে যশের বিল। ভূমি অফিসের খাতায় কোনো পুকুর নেই। ধানি জমি। সরেজমিন জানা গেছে, অন্তত ১০৫টি বড় দিঘি রয়েছে।
১০০ বিঘার একটি পুকুর খনন করতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগী চক্র কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। মাটি বেচে ইটভাটায়। পুকুর লিজ দেয় মাছ চাষিদের।
সরেজমিন বিলে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পুকুর বা দিঘি করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বিলের চারদিকে রয়েছে গোয়ালকান্দি, সাজুরিয়া, দক্ষিণ সাজুরিয়া, সেনোপাড়া, কনোপাড়া, বাজে গোয়ালকান্দি, রামরামাসহ ১১টি গ্রাম। কয়েক বছর আগে বিলটিতে বাঁধ ছিল না। বর্ষায় জলাভূমিতে পরিণত হতো। সেই বিলে টাকি, শৈল, কই, বোয়াল, পুঁটি, ডানকিনা, বাইমসহ নানা জাতের মাছ পাওয়া যেত। বর্ষার পানি নামত বিলে। নিচু এলাকা জলাবদ্ধ হতো না। শীতের শেষের দিকে পানি নেমে শুকিয়ে এলে সেই জমিতে রোপণ করা হতো বোরো ধান, পেঁয়াজ, আলুসহ নানা ফসল। কিন্তু গত ১০ বছরে বিলটিতে পুকুর করা হয়। স্থানীয় কেউ কেউ ধারণা করেন, এখানে ছোট-বড় মিলয়ে ৩০০ পুকুর হয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, অতিবৃষ্টি হলে পানি নামার খাল নেই। ফসলের জমি ডুবে যাওয়াসহ নিচু এলাকা প্লাবিত হয়। দেশি মাছ হারিয়ে যায়।
গোয়ালকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বকুল সরদার বলেন, এ ইউনিয়নটি কৃষিনির্ভর ছিল। ২০১৪ সাল থেকে পুকুর খনন শুরু করেন প্রভাবশালীরা। সাধারণ মানুষ ভয়ে প্রতিবাদ করত না। এখন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ সাজুরিয়া স্কুলমাঠসহ নিচু এলাকা ডুবে যাচ্ছে। বাচ্চারা হাঁটুপানি মাড়িয়ে স্কুলে আসছে। ফসলের জমি অল্প বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে। এখন সরকার যদি খাল খনন করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে দিত, আমরা উপকৃত হতাম।
সাজুরিয়া গ্রামের কাউসার আলী বলেন, এই বিলের মাছে সংসার চলত। বিলের মাঝে খাল ছিল। এখন সেটি বন্ধ। এখন ৯০ ভাগ পুকুর।
স্থানীয় সংবাদকর্মী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আবাদি জমির ইজারা ২০ হাজার টাকা বিঘা। পুকুরের ইজারা মূল্য ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। যে সরকার বা দল ক্ষমতায় থাকুক, পুকুর খনন বন্ধ হচ্ছে না।
তাহেরপুর ভূমি অফিসের সহকারী তহশিলদার গোলাম এজাজ বলেন, প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিল। নাটোর হালতির বিল থেকে বাগমারা হয়ে নওগাঁ সীমান্তে গিয়ে শেষ হয়েছে। শতাধিক পুকুর খনন হয়েছে। এসব জমি কাগজপত্রে ধানি।
কান্তার বিলে ৫৪টি পুকুর
পুঠিয়া উপজেলার কান্তার বিলে আগে ধান আর পেঁয়াজ চাষ হতো। ভূমি অফিসের তথ্যে এখানে পুকুর নেই। তবে সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় ৫৪টি পুকুর খনন করা হয়েছে।
পুঠিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শীলমাড়িয়া ইউনিয়নের পমপাড়া, সুখপাড়া, মঙ্গলপাড়া, উদনপাড়া, রাতোয়াল, নান্দিপাড়া, গোড়াগাছি ও কার্তিকপাড়ায় বিলের প্রায় শতভাগ জমি পুকুর হয়ে গেছে। এসব পুকুর খননে নেতারা একজোট ছিলেন।
পুঠিয়ার তেলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, কান্তার বিলে আগে ধান, পেঁয়াজ ও পাট আবাদ হতো। শুষ্ক মৌসুমে গরু-ছাগল চরাত। বর্ষায় দেশি মাছ হতো। এখন পুকুর করায় এ বিলে আর সাধারণ মানুষ নামতে পারে না।
১১ বছরে শহরে ৮০০ পুকুর ভরাট
গ্রামে পুকুর খনন হলেও রাজশাহী শহরে এর উল্টো চিত্র। গত ১১ বছরে শহরের প্রায় ৮০০ পুকুর ভরাট হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল জানান, ২০১৪ সালে বোয়ালিয়া থানা ভূমি অফিসের জরিপে ৯৫৩টি পুকুর ছিল। তবে গত ১০ বছরে প্রায় ৮০০ পুকুর ভরাট হয়েছে। একই সময়ে সরকারি ৪৮টি পুকুরের মধ্যে ১৭টি ভরাট হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রয়োজনে আটটি এবং ৯টি পুকুর অবৈধভাবে ভরাট হয়েছে। বর্তমানে শহরে ১৫০টি পুকুর আছে।
এদিকে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) মহাপরিকল্পনায় ১৬৭টি পুকুরকে সংরক্ষিত হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো অধিগ্রহণ করা হয়নি। এগুলোও ভরাট হচ্ছে।
বেলার সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল বলেন, একসময় রাজশাহীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় পুকুর ছিল। এখন কোথাও অগ্নিকাণ্ড হলে পানি নেওয়ার পুকুর পাওয়া যায় না। চলতি বছরও প্রায় পাঁচটি পুকুর ভরাট হয়েছে।
হেরিটেজ রাজশাহীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠন সবুজ সংহতির আহ্বায়ক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে শহরের ৬০ শতাংশ পুকুর ভরাট হয়েছে। এ সময় পুকুর, ডোবা-নালা, খাল-ঝিল, নয়নজুলিসহ দেড় হাজার জলাশয় ভরাট হয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৮০ সালে শহরে চার হাজার এবং ১৯৯০ সালে তিন হাজার জলাশয় ছিল। এখন সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩০০ পুকুর আছে। এগুলোও ভরাটে তোড়জোড় চলছে।
পুকুর খননের নেপথ্যে কারা?
এলাকাবাসী জানান, বাগমারা, পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলার কিছু এলাকায় পুকুর খননের পেছনে ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) এনামুল হকের ভাই রেজাউল করিম লেদা, এমপির প্রেস সচিব জিল্লুর রহমান, জাবের বাহিনীর প্রধান জাবের আলী, জেলা পরিষদ সদস্য জাফর মাস্টার, গোয়ালকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আলমগীর সরকার, ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি মো. মিঠুন, বাগমারার সাবেক এমপি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের সহযোগী সোহেল রানা, তার ভাতিজা হাবিবুর রহমান হাবু, সহযোগী তাহেরপুর পৌরসভার কাউন্সিলর কার্তিক সাহা ওরফে মেছো কার্তিক, ওয়ার্ড কাউন্সিলর এরশাদ, তাহেরপুর কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কুরবান খাঁ, বাগমারা উপজেলা যুবলীগ সভাপতি শামীম মীর, আক্কাস মাস্টার, মাহাবুর রহমান, নুরুল ইসলাম, জুগীপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান কামাল হোসেন, ঝিকড়া ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, নরদাস ইউনিয়ন এলাকায় পুকুর খনন করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারোয়ার আবুল ও রামরামা গ্রামের ইটভাটা মালিক আবুল কালাম আজাদ। এ ছাড়া কাউসার, দুলাল, ময়না ও এবায়দুল সোনা পুকুর খনন করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, তারা একসময় ছিলেন সাবেক এমপি এনামুলের ঘনিষ্ঠ। গত নির্বাচনে আবুল কালাম এমপি হলে তাঁর ঘনিষ্ঠ হয়ে যান।
গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বকুল সরদার বলেন, যখন যে এমপি ছিলেন, তাদের ম্যানেজ করে ব্যবসায়ীরা পুকুর খনন করেছেন। এদের অনেকে আগে আওয়ামী লীগের মিছিলে যেত, এখন বিএনপির মিছিলে যায়।
বাগমারার সাবেক এমপি এনামুল হক ও আবুল কালাম আজাদ কারাগারে থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গোয়ালকান্দি ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর সরকার পুকুর কাটার কথা অস্বীকার করে বলেন, আমি পুকুর কাটিনি। তবে গোটা বিলে এখন শতাধিক পুকুর হয়ে গেছে। একেকটি পুকুর ৫০ থেকে ১০০ বিঘা পর্যন্ত। সামান্য কিছু জমি ফাঁকা আছে, সেটাও হয়ে যাবে। তিনি জানান, রামরামা গ্রামের ইটভাটা মালিক আবুল কালাম আজাদ অন্তত ১২টি পুকুর খনন করেছেন। এসব পুকুরের আয়তন অন্তত ৫০০ বিঘা।
এ বিষয়ে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘যশের বিলে আমার পাঁচটা পুকুর ছিল, দুইটা ইজারা দিয়েছি। এখন তিনটা আছে।’
তাহেরপুর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর কার্তিক সাহা বলেন, ‘কোথাও আমি পুকুর খনন করিনি। উজালখলসীতে একটা পুকুর কাটতে গিয়ে পারিনি। পরে বেলালের কাছে বেচে দিয়েছি।’
পুঠিয়ার শীলমাড়িয়া ইউনিয়নে পুকুর খননে জড়িত ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নজরুল ইসলাম, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শুকুর আলী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রহিদুল ইসলাম, চার নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি এরশাদ আলী, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল মেম্বার, সাবেক এমপি মনসুর রহমানের মামাতো ভাই আমজাদ হোসেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদের ঘনিষ্ঠ আব্দুল হান্নান, বাগমারার সাবেক এমপি আবুল কালামের ঘনিষ্ঠ সোহেল রানা, কার্তিক সাহা ও এরশাদ আলী। দুর্গাপুরের আলীপুর বিলে পুকুর খনন করেছেন সোহেল রানা, কার্তিক সাহা ও এরশাদ আলী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, পুকুর খননের ভেকু মালিক জাহাঙ্গীর আলম আগে আওয়ামী লীগের মিছিলে যেতেন, এখন বিএনপির মিছিলে যাচ্ছেন।
পুঠিয়ার কান্তার বিলে পুকুর খননে জড়িত ছিলেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা কৃষক দলের সাবেক সহসভাপতি আনোয়ারুল ইসলাম জুম্মা, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আশরাফুল ইসলাম, পুঠিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম টিপু, আলমগীর হোসেন, আকরাম হোসেন, ফারুক, নাদের, লতিব, মোতালেব হোসেন, লোকমান, হাসেম ও নিজাম। গত বছরের ৫ আগস্টের পর ভাল্লুকগাছি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি পিন্টু মেম্বার, তাঁর সহযোগী রকি, শাহীন মেম্বার, রোকুনুজ্জামান রাকিব পুকুর খনন করেন।
পুকুর খননে জড়িত অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতা গত ৫ আগস্টের পর পলাতক থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। জানতে চাইলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম জুম্মা বলেন, ‘আমি কোনো পুকুর কাটিনি। তবে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করি। কান্তার বিলে এখন অন্তত ৫০টা পুকুর খনন করা আছে। খুব সামান্য জমিই ফাঁকা আছে।’
কমেছে জমি, বেড়েছে মাছ
কৃষি অফিসের হিসাবে, ২০১৫ সালে আবাদি জমি ছিল এক লাখ ৮৬ হাজার ২২৭ হেক্টর। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে এক লাখ ৮৫ হাজার ২৬২ হেক্টর। এ সময় পদ্মার চরে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি বাড়লেও পুকুর খননের কারণে কমেছে অন্যান্য উপজেলার জমি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৫ সালে জেলায় পুকুর ছিল ৪০ হাজার ৭৮৮টি। ২০২৫ সালে এসে হয়েছে ৫১ হাজার ২৭৫টি। জেলা মৎস্য অফিসের খাতা-কলমে ১১ হাজার পুকুর বাড়ানোর হিসাব থাকলেও বাস্তবে তা কয়েক গুণ বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ১০ বছর আগে মুক্ত জলাশয়ে দেশি মাছ উৎপাদন হতো ২৯ হাজার টন। বর্তমানে তা কমে ৭ হাজার ১১৫ টনে নেমেছে। ২০১৫ সালে চাষ করা মাছ উৎপাদন হতো ৩৫ হাজার ৩৯২ টন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে এক লাখ তিন হাজার টন। জেলায় মাছের চাহিদা ৫৪ হাজার টন। এটা পূরণ করে সারাদেশে যাচ্ছে প্রায় ৪৯ হাজার টন। উৎপাদিত চাষের মাছ থেকে রাজশাহীর চাষিরা বছরে আয় করছেন দুই হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অন্য জেলায় পাঠিয়ে আয় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা।
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পুকুর খননের ফলে দেশি মাছ বিলুপ্তির পথে চলে গেছে। জলজ প্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। জমির টপ সয়েল কেটে ইটভাটায় পাঠানো হয়েছে। ময়মনসিংহেও পুকুর হয়েছে। তবে তাদের জমির টপ সয়েল পাড়ে আছে। তারা চাইলে পুকুরকে আবারও সমতল করতে পারবে। রাজশাহীতে এটা সম্ভব না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে সালমা বলেন, এভাবে পুকুর খনন করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা অবৈধ। আমরা চাষিদের আবাদি জমি ধ্বংস করতে নিরুৎসাহিত করছি।
জমির খাজনায় ফাঁকি
ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর আইন অনুযায়ী, কোনো জমি বাণিজ্যিকভাবে বা পুকুর হিসেবে ব্যবহার করলে বছরে প্রতি শতাংশে ইউনিয়ন এলাকায় ৪০ টাকা এবং পৌর এলাকায় ৬০ টাকা করে কর দিতে হবে। আর ধানি জমির খাজনা মওকুফ। তবে ২৫ বিঘার ওপরে হলে ২ টাকা শতাংশ খাজনা।
জেলায় কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে পুকুর থাকলেও সরকার কর পাচ্ছে না। কারণ, কাগজপত্রে এগুলো ধানি জমি।
এসব বিষয়ে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মহিনুল হাসান বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কৃষিজমি রক্ষায় অবৈধ পুকুর খননরোধে কাজ করছে। পুকুর খননের খবর পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। তিনি বলেন, নতুন জরিপ শুরু হলে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন হয়ে যাবে। এখনও বিষয়টি ভূমি অফিসের নজরে এলে উন্নয়ন কর ব্যবহারভিত্তিক আদায় করা হবে।
গবেষকরা যা বলছেন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক লতিফুর রহমান বলেন, পুকুর খনন, শিল্পকারখানা স্থাপন, বাড়িঘর নির্মাণসহ নানা কারণে জলাভূমি নষ্ট হচ্ছে। এতে দেশি মাছ, পাখি, জলজপ্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ হওয়ার জন্য জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে জলাভূমি তা ধারণ করে। জলাভূমি না থাকলে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে বন্যার আশঙ্কা থাকে। জলবায়ুর ওপরও প্রভাব পড়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এবিএম মোহসিন বলেন, তানোর, পবা, মোহনপুর, পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও বাগমারা এলাকায় বিলগুলোতে পুকুর হয়েছে। এতে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। পানি প্রবাহ নেই। কোথাও জলাবদ্ধতা হচ্ছে। আবার কোথাও পানি প্রবেশ করতে পারছে না। বিলের মাঝ দিয়ে অনেক রাস্তা ও পাড় হয়েছে। এতে দেশি মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক আখতার হোসেন বলেন, চাষিরা অতিরিক্ত লাভের আশায় বিলগুলো পুকুরে পরিণত করেছেন। সেখানে মাছ চাষ হচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। ধানের জমি ধ্বংস হচ্ছে। দেশি প্রজাতির ছোট মাছ হারিয়ে গেছে। আমরা বড় মাছের সঙ্গে দেশি শিং, মাগুর ও গুলশা চাষের উৎসাহ দিচ্ছি।
