ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নাজিরপুরে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক

ভূতুড়ে ঋণ, সঞ্চয় লোপাট

ভূতুড়ে ঋণ, সঞ্চয় লোপাট
×

নাজিরপুর (পিরোজপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৩০ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫০

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক থেকে বেশ কয়েক দফায় ঋণ নিয়েছেন হাফিজুর রহমান। প্রত্যেকবারই কিস্তি শোধ করেছেন। সর্বশেষ ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। ছয়টি কিস্তি জমা দেওয়ার কয়েক মাস পর শুনতে পারেন, তাঁর ঋণের বিপরীতে ওই ব্যাংকের কার্যালয়ে জমা পড়েছে মাত্র একটি কিস্তি। যে মাঠকর্মীর কাছে কিস্তি দিতেন তিনিও লাপাত্তা।

নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি দোবড়া ও শ্রীরামকাঠী ইউনিয়নের কিছু গ্রাহক এমন বিপাকে পড়েছেন। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক শেয়ারের মালিক সরকারের একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প। এই প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় ৯টি ইউনিয়নে সমিতি আছে দুইশর মতো। এসব সমিতিতে সদস্য ৮ হাজার ৫৮২ জন। এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১২ কোটি টাকার সরকারি ঋণ আছে।

দেউলবাড়ি দোবড়া ইউনিয়নের পাকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের মে মাসে সর্বশেষ তিনি ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেন। মাসে চার হাজার টাকা করে ছয়টি কিস্তিও দেন ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাঠকর্মী গৌতম মণ্ডলের কাছে। কয়েক মাস আগে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের কল পেয়ে ব্যাংকে যান। সেখানেগিয়ে জানতে পারেন, তাঁর ঋণের বিপরীতে মাত্র চার হাজার টাকা জমা হয়েছে। বাকি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছেন মাঠকর্মী গৌতম মণ্ডল। 

ব্যাংকের উপজেলা শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে মো. মহিউদ্দিন যোগ দেন ২০২৪ সালের নভেম্বরে। তিনি বলেন, শাস্তি হিসেবে গৌতমকে জেলা অফিসে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু জেলা অফিসে যোগাযোগ করে জানা গেছে, তিনি যোগদান করেননি। গ্রাহকের ১৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে তিনি লাপাত্তা।
গত ১৬ আগস্ট দেউলবাড়ি দোবড়া ইউনিয়নের মাঠকর্মী হিসেবে যোগ দেন মো. রাহাত শেখ। মাঝের সময়টুকুতে সেখানে নির্ধারিত মাঠকর্মী ছিলেন না। রুহুল আমিন নামের অন্য ইউনিয়নের এক মাঠকর্মী অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কোনো ঋণ দেননি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

হাফিজুরের মতোই প্রতারণার শিকার শ্রীরামকাঠী ইউনিয়নের ভীমকাঠী গ্রামের গৃহবধূ অঞ্জলী ব্যানার্জি। ওই গ্রামের পরিমল রায়ের স্ত্রী অঞ্জলী ২০২৩ সালের অক্টোবরে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন। তাঁর হিসাবে ব্যাংকের পাওনা তিন হাজার টাকা। একাধিকবার কিস্তি নিতে  ইউনিয়নের মাঠকর্মী শামছুল হককে কল দিলেও তিনি আসেননি। পরে শোনেন, গত জানুয়ারিতে শামছুল বদলি হয়েছেন। পরে অফিসে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, তাঁর নামে এখনও ২০ হাজার টাকা বকেয়া। তাঁর বইও কর্মী নিয়ে গেছেন।

একই ইউনিয়নের দিপালী দাশের ভাষ্য, মাঠকর্মী সামছুল হক ঋণ দেওয়ার কথা বলে এক হাজার ৬০০ টাকা সঞ্চয় নেন। পাঁচ-সাত দিন তাঁকে অফিসে নিয়ে ঘুরিয়েছেন। ঋণ তো দূরের কথা, সঞ্চয়ই ফেরত দেননি তিনি। কিছুদিন আগে অফিস থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, তাঁর নামে ২০ হাজার টাকা তোলা হয়েছে। একই ইউনিয়নের বাসিন্দা মুক্তা ব্যানার্জির ভাষ্য, তাঁর নামেও কোনো ঋণ ছিল না। তাঁর পাস বইও পরিশোধ করা। কিন্তু সম্প্রতি জানতে পারেন, তাঁর স্বামী নাকি ২০ হাজার টাকা ঋণ তুলেছেন। অথচ ঋণের জন্য গ্রাহক হিসেবে তিনি, তাঁর স্বামী ও পরিচিত একজনের সই লাগে। 

ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের গ্রাহকদের পাস বই মাঠকর্মীরা নিজেদের কাছে সংরক্ষিত রাখেন। গ্রাহকের কাছ থেকে তোলা ঋণ ও সঞ্চয়ের টাকা সাদা কাগজে লিখে দিয়ে আসেন। গ্রাহকরা যদি সেই কাগজ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে ঋণ ও সঞ্চয়ের টাকার হিসাবই মেলানো যায় না।

এসব বিষয়ে ১৬ অক্টোবর দেউলবাড়ি দোবড়া ইউনিয়ন পাকুরিয়া গ্রামের হাফিজুর রহমান, দেবলাল চক্রবর্তী, শ্রীরামকাঠীর ভীমকাঠী গ্রামের অঞ্জলী ব্যানার্জি ও মুক্তা ব্যানার্জি ১৬ অক্টোবর ব্যাংকের উপজেলা কার্যালয়ে অভিযোগ দেন। ৩০ অক্টোবর অভিযোগ দিয়েছেন শ্রীরামকাঠী ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামে পুষ্পা দাশ ও দিপালী দাশ, রীনা বেপারী, সাজ্জাদ হোসেন ও রাজীব মণ্ডল।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে সামছুল হক ও গৌতম মণ্ডলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টাও করেও ব্যর্থ হন এই প্রতিবেদক। শ্রীরামকাঠী ইউনিয়নের মাঠকর্মী হিসেবে গত ১ সেপ্টেম্বর যোগ দিয়েছেন পংকজ কুমার রায়। তিনি বলেন, ‘মাঠে জানতে পারছি, নানা সমস্যা আছে। আগের মাঠকর্মী অনেক সদস্যের টাকা নিয়ে তা পাস বইয়ে জমা করেননি। আবার সদস্যদের কাছ থেকে লোন দেওয়ার কথা বলে সঞ্চয় নেওয়া হয়েছে। কিন্তু লোন বা সঞ্চয় কিছুই দেওয়া হয় নাই।’

পাস বইয়ের ব্যাপারে পংকজ রায় বলেন, ‘একশর মতো বই তাঁর কাছে আছে, বাকিগুলোর হদিস জানেন না। অডিট করার জন্য বই কাছে রাখা হয়েছে। অডিট শেষ হলে গ্রাহকদের দেওয়া হবে।’

ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে মো. মহিউদ্দিনের ভাষ্য, ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে যাদের কিস্তি দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া, তাদের তাগদা দেন তিনি। তখন অনেকে এসে জানান, ঋণ পরিশোধ করেছেন। কিন্তু জমা হয়নি। এ পর্যন্ত ৯টি লিখিত অভিযোগ পেয়েছেন। এসব ঋণের সময় তিনি  ছিলেন না, তাই সঠিক অঙ্ক বের করতে সময় লাগবে। 

আরও পড়ুন

×