ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চবি ভর্তি পরীক্ষায় বড় পরিবর্তন: বাতিল ‘পোষ্য কোটা’, কমল জিপিএ শর্ত

চবি ভর্তি পরীক্ষায় বড় পরিবর্তন: বাতিল ‘পোষ্য কোটা’, কমল জিপিএ শর্ত
×

ফাইল ছবি

মেহেদী হাসান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১৭:৪৯

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় বড় পরিবর্তন এসেছে। কমানো হয়েছে ২২৫ টি আসন সংখ্যা। আবেদন যোগ্যতায় কমানো হয়েছে দশমিক ৫০ জিপিএ। বাতিল করা হয়েছে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর সন্তানদের পোষ্য কোটা। 

আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন চলবে। ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে ২ জানুয়ারি থেকে। আগের বছরের মতো এবছরও ভর্তি পরীক্ষা চট্টগ্রামের পাশাপাশি বিভাগীয় শহর ঢাকা ও রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হবে।

মঙ্গলবার সকালে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক এনায়েত উল্যাহ পাটওয়ারী ও কলা ও মানববিদ্যা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. ইকবাল শাহীন খান।

পোষ্য কোটা বাতিল 
গতবার পোষ্য কোটায় ছিল ১৬৬টি আসন, যা এবার শূন্য থাকবে। রোববার সকাল দশটায় উপাচার্যের দপ্তরে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা কমিটির দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তনসহ পোষ্য কোটার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার। 

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, বিভিন্ন অনুষদের ডিন এবং ভর্তি কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পোষ্য কোটা বাতিল কেনো করা হয়েছে সে ব্যাপারে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পোষ্য কোটা রাখা হলে শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যম চাপ দেওয়া শুরু করবে। এতে অস্থিতিশীল পরিবেশ এড়াতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেকের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে যে, পোষ্য কোটা বাতিল করা হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে পারে। তবে পোষ্য কোটা ৫৪টা বিভাগে ৫৪ টা আসন ছিলো যা এবার আসন শূন্য অবস্থায় থাকবে।’

রয়েছে যে ৯ ধরনের কোটা 

সভা সূত্র ও একাধিক ডিনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বছর ৪ হাজার ৩০৫টি আসনের বিপরীতে পরীক্ষা নেওয়া হবে। এর মধ্যে সাধারণ আসন ৩ হাজার ৭৮৬ ও বাকি ৫১৯টি কোটার জন্য বরাদ্দ। গত বছর এ আসন ছিল ৪ হাজার ৬৮৪টি। এর মধ্যে ৪ হাজার ১১টি সাধারণ আসন আর বাকি আসন কোটার জন্য বরাদ্দ ছিল। এ বছর পোষ্য কোটায় বরাদ্দ ১৬৬ টি আসন কমছে।

এ বছর ভর্তি পরীক্ষায় ৯ ধরনের কোটা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২১২ টি আসন রাখা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা এ কোটা পাবেন। দ্বিতীয় ১১১টি আসন রাখা হয়েছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য। অন্যদিকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের জন্য ৯৪টি, অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের ৬টি, অ-উপজাতি কোটা (পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি) ৫১টি, শারীরিক প্রতিবন্ধী কোটা ২০টি, বিকেএসপি কোটা ১১টি, পেশাদার খেলোয়াড় কোটা ৫টি ও দলিত জনগোষ্ঠী কোটা ৯টি।

অধ্যাপক মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী বলেন, ‘পোষ্য কোটা ছাড়া বাকি কোটাগুলোর আসন অপরিবর্তিত। ফলাফলভিত্তিক পাঠ্যক্রমের কারণে এক ক্লাসে ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রাখা যাবে না। তাই আসন কিছুটা কমানো হয়েছে, যেন বড় ক্লাসগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে পাঠদান করা যায়।’

পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন 

এর আগে গত ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। রোববারের সভায় সেই সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে চলবে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

প্রথম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ আগামী বছরের ২ জানুয়ারি (শুক্রবার), বি ইউনিটের ৩ জানুয়ারি (শনিবার), সি ইউনিটের ৯ জানুয়ারি (শুক্রবার), ডি ইউনিটের ১০ জানুয়ারি (শনিবার) এবং বি ১ উপ-ইউনিটের ৫ জানুয়ারি (সোমবার), বি ২ উপ-ইউনিটের ৬ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) ও ডি ১ উপ-ইউনেটের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ১২ জানুয়ারি (সোমবার)।

এর আগে সম্ভাব্য সময়সূচিতে এ ইউনিটের তারিখ অপরিবর্তিত থাকলেও কিছু ইউনিটের পরীক্ষার দিন পরিবর্তন এসেছে।

পরিবর্তিত সময়সূচি অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে আগামী বছরের ২ জানুয়ারি (শুক্রবার) এ ইউনিটের পরীক্ষার মাধ্যমে। নতুন সূচি অনুযায়ী ৩ জানুয়ারি (শনিবার) ডি ইউনিট, ৫ জানুয়ারি (সোমবার) ডি–১ উপ–ইউনিট, ৭ জানুয়ারি (বুধবার) বি–১ উপ–ইউনিট, ৮ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) বি–২ উপ–ইউনিট, ৯ জানুয়ারি (শুক্রবার) সি ইউনিট এবং ১০ জানুয়ারি (শনিবার) বি ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পূর্বের সম্ভাব্য সময়সূচিতে বি–১ উপ–ইউনিটের পরীক্ষা ছিল ৫ জানুয়ারি, বি–২ উপ–ইউনিটের ৬ জানুয়ারি এবং ডি–১ উপ–ইউনিটের ১২ জানুয়ারি। 

আসন কমেছে ২২৫ টি 

চবিতে এবার মোট আসন ২২৫টি কমেছে। গতবার ছিল ৪ হাজার ১১টি, এবার ৩ হাজার ৭৮৬টি। তবে মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ ৯টি কোটায় মোট ৫১৯টি আসন অপরিবর্তিত থাকছে।

এ বছর ভর্তি পরীক্ষায় ১৮ বিভাগ থেকে ২২৫টি আসন কমানো হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা, ইংরেজি, রসায়ন, অর্থনীতি, রাজনীতিবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, লোক প্রশাসন ও আইন বিভাগের আসনও ১১০ থেকে ১০০ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদভুক্ত অ্যাকাউন্টিং, ব্যবস্থাপনা, ফাইন্যান্স ও মার্কেটিং বিভাগের আসনও ১১০ থেকে ১০০ করা হয়েছে। অন্যদিকে ইতিহাস, দর্শন, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আসন ১২০ থেকে ১০০, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে ১০৫ থেকে ১০০ করা হয়েছে।

ভর্তি পরীক্ষায় আসনসংখ্যা ২০টি বিভাগের মোট ২২৫টি কমেছে। এর মধ্যে এ ইউনিটের রসায়ন বিভাগের আসন ১১০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়েছে। বি ইউনিটে বাংলা ও ইংরেজি বিভাগের আসন ১১০ থেকে ১০০ করা হয়েছে এবং ইতিহাস, দর্শন ও ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের আসন ১২০ থেকে ১০০ করা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা বিভাগের আসন ১০৫ থেকে ১০০ করা হয়েছে। বি-২ উপ-ইউনিটের আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আসন ১২০ থেকে কমে ১০০ হয়েছে। সি ইউনিটের অ্যাকাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট, ফাইন্যান্স ও মার্কেটিং বিভাগের আসন ১১০ থেকে ১০০ করা হয়েছে। ডি ইউনিটের অর্থনীতি, রাজনীতিবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, লোকপ্রশাসন ও আইন বিভাগের আসনও ১১০ থেকে ১০০ করা হয়েছে। 

সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক এনায়েত উল্যাহ পাটওয়ারী বলেন, এই বছর থেকে তো ক্লাস ভাগ করা হবেনা। “ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা পাঠক্রম” আমাদের ২০২৫-২৬ থেকে না পরবর্তীতে শুরু হবে। তখন আমরা বাৎসরিক না সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করে ৪০ জন করেই ভর্তি নিবো। তখন সিরিয়াল করে ক্লাসের শিক্ষার্থী ঠিক করা হবে। এখন ১০০ জন করেই আমরা ভর্তি নিবো। ক্লাসে শিক্ষার্থী কমাচ্ছি।

আবেদন যোগ্যতা কমলো

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ফলাফল তুলনামূলক খারাপ হওয়ায় এবারের ভর্তি যোগ্যতা কিছুটা কমানো হয়েছে। মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা—তিন ক্ষেত্রেই মোট জিপিএ ন্যূনতম মান কমেছে।

এ ইউনিটে এবার আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক (চতুর্থ বিষয়সহ) মিলিয়ে মোট জিপিএ ৭ দশমিক ৫০ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আলাদাভাবে মাধ্যমিকে ন্যূনতম ৪ ও উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ ৩ থাকতে হবে।

মানবিক অনুষদভুক্ত বি ইউনিটে আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে চতুর্থ বিষয়সহ মোট জিপিএ ৬ দশমিক ৫০ নির্ধারণ করা হয়। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম জিপিএ লাগবে ৭। এ ছাড়া মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদাভাবে ন্যূনতম জিপিএ ২ দশমিক ৫০ আর বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে জিপিএ ৩ থাকতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ইয়াহ্ইয়া আখতার সমকালকে বলেন, ‘আমি ভর্তি পরীক্ষার এই প্রক্রিয়া সন্তুষ্ট না। ভর্তি প্রক্রিয়া যদি একদিন সমাপ্ত করা যেতো তাহলে আমার কাছে ভালো লাগতো। কারণ বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিভাবকরা এসে তাদের সন্তানদের জন্য থাকার ও যাতায়াতের অসুবিধার সম্মুখীন হয়। একদিনেই পরীক্ষা হলে ছাত্রদের ভোগান্তি কমানো যেত। বিশ্বের অন্যান্য দেশে ভর্তি পরীক্ষা একদিনেই সম্পন্ন করা হচ্ছে। তাহলে বাংলাদেশে কেন সম্ভব হয় না।'

তিনি আরো বলেন, ‘বিগত সময়ে ভর্তি পরীক্ষায় যেসব সমস্যা দেখা যেত, সেগুলো সমাধানের জন্য আমরা ভর্তি প্রক্রিয়ায় কিছু নতুনত্ব এনেছি। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।’

আরও পড়ুন

×