জিল বাংলা চিনিকল লিমিটেড
পুঞ্জীভূত ঋণের সুদ টানতে গিয়ে চিনিকলে লোকসান
রাজ্জাক মিকা, দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর)
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেওয়ানগঞ্জের জিল বাংলা চিনিকলে ২০২১ সালের জুন মাস নাগাদ ঋণ ছিল ৪৫০ কোটি টাকা। বর্তমানে সুদসহ পুঞ্জীভূত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭০৬ কোটি ২ লাখ টাকায়। পুঞ্জীভূত ঋণের বিপরীতে শুধু ২০২৫ সালের জুন মাসে সুদ দিতে হয়েছে ৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। তিন বছরের সুদের সামারি হিসাব করলে দেখা যায়, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ৮৪ কোটি এক লাখ টাকা সুদ দিতে হয়েছে। যার কারণে প্রতি অর্থবছরে মিলটির লোকসানের বোঝা বড় হচ্ছে।
জিল বাংলা চিনিকল লিমিটেড উৎকৃষ্ট মানের চিনি উৎপাদনকারী ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। দেশের অন্যান্য মিলের তুলনায় জিল বাংলা চিনিকলে উৎপাদনের হার সর্বাধিক। গত পাঁচ বছরের তথ্য ঘেটে দেখা যায়, ২০২০-২১ মৌসুমে ৬ দশমিক ৬৪, ২০২১-২২ মৌসুমে ৭, ২০২২-২৩ মৌসুমে ৬ দশমিক ৬১, ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৬ দশমিক ০৪ এবং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ আখ মাড়াই মৌসুমে মিলটির চিনি উৎপাদনের হার ছিল ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এরপরও প্রতি অর্থবছরে চিনিকলটিকে গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ লোকসান। কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত ঋণের সুদ দিতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে মিলটিকে।
জিল বাংলা চিনিকল লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) শরিফ মো. জিয়াউল হকের ভাষ্য, ২০২১ সালের জুন মাস নাগাদ মিলটিতে ৪৫০ কোটি টাকা ঋণ ছিল। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের ২১৬ কোটি এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের ২৩৪ কোটি টাকা। বর্তমানে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭০৬ কোটি ২ লাখ টাকায়। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের ২৭৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, সরকার ও অন্যান্য খাতে ১৮৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের কাছে ২৪৪ কোটি ৫ লাখ টাকা। তার বিপরীতে গত ২৩ সালের জুন মাস নাগাদ ২৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, ২৪ সালের জুন মাস নাগাদ ২৬ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং ২০২৫ সালের জুন মাস নাগাদ ৩২ কোটি ৩০ লাখ টাকা সুদ দিতে হয়েছে। সুদ মওকুফ করা হলে মিলটির লোকসান ৭০ শতাংশ কমে আসবে বলে দাবি তাঁর।
গত পাঁচ বছরের আখ মাড়াই, চিনি উৎপাদন ও লাভ-লোকসানের রেকর্ড অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০-২১ মৌসুমে ৭২ দিনে ৫৮ হাজার ৯৫১ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে ৩ হাজার ৯০৮ দশমিক ৫০ টন। ওই মৌসুমে লোকসান ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ২০২১-২২ মৌসুমে ৪৪ দিনে ৩৫ হাজার ৬৯৮ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে ২ হাজার ৪৯৮ টন। ওই মৌসুমে লোকসান ৫২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ মৌসুমে ৪১ দিনে ৩৫ হাজার ১৭১ দশমিক ৬৬ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে ২ হাজার ৩২২ টন। ওই মৌসুমে লোকসান ৫৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৫২ দিনে ৪৪ হাজার ৯৮৮ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে ২ হাজার ৭১৭ টন। ওই মৌসুমে লোকসান ৪৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ মাড়াই মৌসুমে ৮৩ দিনে ৭২ হাজার ৭৯ টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন করে ৪ হাজার ৫৯৯ টন। ওই মৌসুমে লোকসান ৪৭ কোটি ২০ লাখ টাকা।
জিল বাংলা চিনিকল ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি একেএম রায়হানুল আজীম ইমরানের ভাষ্য, পুঞ্জীভূত ঋণের সুদ দিতে গিয়ে প্রতি অর্থবছরে বাড়তি লোকসানের মুখে পড়ছে মিলটি। এ অবস্থায় স্বল্প মূলধনে ‘বাই প্রোডাক্ট’ উৎপাদন করতে পারলে মিলটি লাভবান হবে। পুঞ্জীভূত ঋণের সুদ মওকুফ করে স্বল্প মূলধনে বাই প্রোডাক্ট উৎপাদন প্রজেক্টের জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
জিল বাংলা চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) কাওছার আলী সরকার জানান, দেশের অন্যান্য চিনিকলের তুলনায় জিল বাংলা চিনিকলে চিনি আহরণের হার সর্বাধিক। এরপরও পুঞ্জীভূত ঋণের কারণে মিলটিকে প্রতি বছর লোকসান দিতে হচ্ছে। সুদ মওকুফ করে শিল্পে বহুমুখী করা হলে মিলটি লাভজনক হবে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় জিল বাংলা চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তরিকুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, জিল বাংলা চিনিকল লিমিটেড বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্টমানের চিনি উৎপাদনকরী প্রতিষ্ঠান। পুঞ্জীভূত ঋণের কারণে মিলটিকে প্রতি বছর লোকসানের বোঝা টানতে হচ্ছে। পুঞ্জীভূত ঋণের সুদ মওকুফের জন্য সদরদপ্তরে জানিয়েছেন আগের এমডিরা। সরকার সদয় হয়ে ঋণের সুদ মওকুফ করলে মিলটির লোকসান একেবারেই কমে আসবে।
- বিষয় :
- চিনিকল
- জিল বাংলা চিনিকল
- লোকসান
- সুদ
