ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

কৃষিতে অংশগ্রহণ বেড়েছে নারী শ্রমিকের, মূল্যায়ন নেই

কৃষিতে অংশগ্রহণ বেড়েছে নারী  শ্রমিকের, মূল্যায়ন নেই
×

মাধবপুরের সুরমা এলাকায় টমেটো ক্ষেতে কাজ করছেন নারী শ্রমিক। শুক্রবার দুপুরে সমকাল

মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৬ | আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় কৃষিখাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে অনেক কম মজুরি পাচ্ছেন তারা। কোথাও পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে অর্ধেক, কোথাও অর্ধেকের সামান্য বেশি মজুরি দেওয়া হয়। কৃষিতে শ্রমমূল্য নির্ধারণে কোনো সরকারি নীতিমালা না থাকায় কৃষক বা খামারির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই হয়ে উঠেছে মজুরির একমাত্র মানদণ্ড। এতে নারী কৃষিশ্রমিকরা বছরের পর বছর ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন।

গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি হলেও নারী শ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন নেই। ধান রোপণ, চারা তৈরি, আগাছা পরিষ্কার, সবজি সংগ্রহ, ফসল কাটাসহ প্রায় সব ধরনের পরিশ্রমী ও দক্ষ কাজে নারীরা সমানভাবে অংশ নিলেও পুরুষদের তুলনায় গড়ে ৩০-৫০ শতাংশ কম মজুরি পাচ্ছেন।

মাধবপুরের ধর্মঘর, চৌমুহনী, তেলিয়াপাড়া, শাহজাহানপুর, নোয়াপাড়া, জগদীশপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমিতে নিয়মিত নারীশ্রমিকদের কাজ করতে দেখা যায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় বিরতিহীনভাবে কাজ করলেও এসব নারীশ্রমিক দিনে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকা মজুরি পান। 

কয়েকজন নারীশ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মজুরি নির্ধারণে কোনো নিয়ম না থাকায় কৃষকরা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেন। আর প্রতিবাদ করলে কাজ থেকে বাদ পড়ার ভয় থাকে।
সুরমা চা বাগানের নারীশ্রমিক মালতি ভোমিজ জানান, চা বাগানে কাজ না থাকলে তারা কৃষিজমিতে শ্রম দেন। কিন্তু এখানে মজুরি নিয়ে কোনো নিয়ম নাই। পুরুষরা যেখানে ৪০০ টাকা পায়, তাদের দেওয়া হয় ২৫০ টাকা। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে পরদিন আর কাজে ডাকে না। বাধ্য হয়ে কম মজুরিতেই কাজ করতে হয়। 

তেলিয়াপাড়ার আয়েশা আক্তার বলেন, কৃষিতে নারীশ্রমিকদের স্থির মজুরি কখনও ছিল না। মৌসুমে কাজ একটু বাড়লে হয়তো ২০-৩০ টাকা বেশি দেয়। আবার অন্য সময় কমিয়ে দেয়। কৃষক বা খামারিরা যা বলে তাই নিতে হয়। 

বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের অবনি সাঁওতালের ভাষ্য, ধান রোপণের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করতে হয়। কিন্তু নারীশ্রমিকের পারিশ্রমিক নিয়ে কারও কোনো চিন্তা নাই। দিন শেষে হাতে ধরিয়ে দেয় ২৫০ টাকা। নারীশ্রমিকের কষ্টের দাম কেউ দিতে চায় না। 

মাধবপুর কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় মৌসুমভিত্তিক কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকেন প্রায় ৬ হাজার নারীশ্রমিক। কোথাও নারীশ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট মজুরি নির্ধারণ বা তালিকা নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ ও নারীশ্রমিকের মজুরি বৈষম্য ঘুচছে না। 

মাধবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সজীব সরকার বলেন, নারীরা কৃষিকাজে সমান দক্ষতা দেখাচ্ছেন। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। খামারিরা নিজের মতো মজুরি নির্ধারণ করায় এই বৈষম্য টিকে আছে। কৃষিশ্রম নিয়ে কোনো সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়িত না হওয়ায় সমস্যা আরও জটিল। 

কৃষকদের যুক্তি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা বেশি মজুরি দিতে পারেন না। পরমানন্দপুর গ্রামের খামারি আমজাদ আলীর ভাষ্য, নারীশ্রমিকের মজুরি বাজার দেখে ঠিক করা হয়। সার, বীজ, পানি সবকিছুর দামই বেশি। তাই মজুরি বাড়ানো কঠিন। তার ওপর নারীশ্রমিক পুরুষের সমান কাজ করতে পারেন না বা কৃষিকাজে তাদের দক্ষতা কম অনেকের মধ্যে এই ধারণা রয়েছে। 

মাধবপুর উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা পিয়ারা বেগম বলেন, নারী শ্রমের অবমূল্যায়ন শুধু অর্থনৈতিক নয়– এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্যের ফল। নীতিমালা না থাকা এবং মজুরি তদারকির অভাবে নারীরা আরও দুর্বল অবস্থায় পড়ে। সরকারি উদ্যোগ ছাড়া মজুরি বৈষম্যের প্রতিকার সম্ভব নয়।

মাধবপুর ইউএনও জাহিদ বিন কাসেম বলেন, মজুরি বৈষম্য দূর হলে নারীশ্রমিকদের জীবনমান যেমন উন্নত হবে, তেমনি শক্তিশালী হবে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি। নারী কৃষিশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নেবে। প্রয়োজনে সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও তদারকি বাড়ানো হবে।

আরও পড়ুন

×