ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যান ও যন্ত্র আছে, চালক নেই অলস পড়ে থেকেই নষ্ট

খুলনা সিটি করপোরেশন

যান ও যন্ত্র আছে, চালক নেই অলস পড়ে থেকেই নষ্ট
×

নগরীর সড়ক পরিষ্কারের জন্য ‘ রোড সুইপিং কার’ কেনা হয়েছিল ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা দিয়ে। গত ১০ বছরে গাড়িটি ১০ দিনও ব্যবহার হয়নি। বর্তমানে নষ্ট হয়ে কেসিসি গ্যারেজে পড়ে আছে সমকাল

হাসান হিমালয়, খুলনা

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:১২ | আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সড়কের ধুলো-ময়লা পরিষ্কারের জন্য ২০১৬ সালে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা দিয়ে একটি রোড সুইপিং মেশিন কিনেছিল খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। দক্ষ চালকের অভাবে এটি ১০ দিনও ব্যবহার হয়নি। পড়ে থেকেই নষ্ট হচ্ছে এই যান। 

খাল ও নদী খননের জন্য ২০২৩ সালে ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা দিয়ে ওয়াটার মাস্টার নামে একটি ভাসমান খননযন্ত্র কিনেছিল কেসিসি। যন্ত্রটি দিয়ে কিছুদিন নদী খনন করা হয়। গত ২৩ জুলাইয়ের পর থেকে যন্ত্রটি আর ব্যবহার হয়নি।

প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা দিয়ে দুই মাস আগে কনটেইনারের বর্জ্য স্থানান্তরের জন্য সাতটি রিয়ার ট্রিপিং ট্রাক কেনা হয়েছে। ট্রাকগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কনটেইনার ভর্তি বর্জ্য ট্রাকে ফেলে আবার কনটেইনার জায়গা মতো রেখে দেয়। এই সাতটি ট্রাকের মধ্যে মাত্র একটি এখন ব্যবহার হচ্ছে। চালক না থাকায় ছয়টি ট্রাক রেখে দেওয়া হয়েছে কেসিসির অ্যাসফল্ট প্লান্টে।

শুধু এ তিন ধরনের যন্ত্রই নয়, গত কয়েক বছরে কেসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে নতুন আধুনিক যন্ত্র ও যানবাহন সংযোজন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রকল্প থেকেই ৪৭ কোটি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে ৩৫টি আধুনিক যান। কিন্তু অভিজ্ঞ ও দক্ষ চালকের অভাবে এর বেশির ভাগই ব্যবহার হচ্ছে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে গতি আনতে ২১ কোটি টাকা দিয়ে আরও ৩৮টি যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়া চলছে। চালক না থাকায় সেগুলোর ব্যবহার নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

যান্ত্রিক শাখা থেকে জানা গেছে, বর্তমানে কেসিসিতে ১৮৯টি যানবাহন ও যন্ত্র চালানোর জন্য চালক রয়েছেন ১০০ জন। তাদের মধ্যে ৩৫ জন স্থায়ী। ৩৯ জন মাস্টাররোলে কর্মরত। আউটসোর্সিংয়ে নেওয়া চালক রয়েছেন ২৬ জন। ১০০ চালকের কারও ভারী যানবাহন চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। তাদের দিয়েই নতুন যন্ত্র চালানোর চেষ্টা চলছে। এতে পুরোনোগুলো অকেজো থাকছে। 

যান্ত্রিক বিভাগের একমাত্র কর্মকর্তা উপসহকারী প্রকৌশলী সেলিমুল আজাদ বলেন, চালক না থাকায় নতুন অনেক যান ও যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। নতুন করে ৯১ জন চালকের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

চালকের অভাবে বন্ধ গাড়ি ও যন্ত্র
কেসিসির যান্ত্রিক বিভাগ থেকে জানা গেছে, বর্জ্য ভর্তি কনটেইনার থেকে বর্জ্য নেওয়ার জন্য সাত কোটি ৪৪ লাখ টাকা দিয়ে পাঁচটি ‘গার্বেজ কমপ্যাক্ট ট্রাক’ কেনা হয়েছে। এর মধ্যে অন্য যানের চালক দিয়ে নতুন তিনটি ট্রাক চালানো হচ্ছে। চালকের অভাবে বন্ধ রয়েছে দুটি। যে তিনজন চালক নতুন কমপ্যাক্ট ট্রাক চালাচ্ছেন, তাদের নির্ধারিত ট্রাকগুলো বসিয়ে রাখা হয়েছে। 

বাসাবাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে পয়ঃবর্জ্য পরিবহনের জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা দিয়ে এক হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতার দুটি ভ্যাকুট্যাগ কেনা হয়েছে। চালানোর লোক না থাকায় গাড়ি দুটি অ্যাসফল্ট প্লান্টে পড়ে আছে।
মাঝারি আকারের ব্যাক হুইল লোডার (বর্জ্য ট্রাকে তোলার জন্য ব্যবহৃত হয়) কেনা হয়েছে চারটি। এর একটি চলছে, বাকিগুলো বন্ধ রয়েছে। 

রাজবাঁধের বর্জ্য ফেলার স্থানে কেসিসির দুটি বুলডোজার রয়েছে। একজন চালক ওই দুটি পরিচালনা করেন। নতুন করে একটি চেইন ডোজার এবং দুটি পে-লোডার কেনা হয়েছে। চালক সেই একজনই রয়েছেন। রাজবাঁধের জন্য এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা দিয়ে নতুন একটি লং বুম এক্সক্যাভেটর কেনা হচ্ছে। এটির জন্যও চালক বরাদ্দ নেই। 

এ ছাড়া খালের কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য একটি উইড হার্ভেস্টার, ড্রেনের পেড়িমাটি অপসারণের জন্য একটি সাকার মেশিন, ভারী বস্তু উত্তোলনের জন্য একটি ফর্ক লিফট এবং ওয়ার্ডের ভেতরে ছোট সড়কের বর্জ্য পরিবহনের জন্য এক টনের ৩০টি ছোট ট্রাক কেনা হচ্ছে। এই যানগুলোর জন্যও কোনো চালক নেই।

যান্ত্রিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনিসুজ্জামান বলেন, এখন যন্ত্রগুলো কেনা হচ্ছে, চালকের জন্য চিঠি লেখা হয়েছে। চালক এক সময় পাওয়া যাবে; কিন্তু এখনই যন্ত্রগুলো কেনা না হলে ভবিষ্যতে এসব কেনা কঠিন হয়ে পড়বে।

ঝাড়ুদার, নর্দমা শ্রমিকরাও চালক
কেসিসির নির্বাহী প্রধান হলেন মেয়র বা প্রশাসক। তাঁর জন্য একটি পাজেরো গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে। সেই গাড়ি চালান খোরশেদ আলম নামের কর্মচারী। কেসিসির নথিতে তিনি স্থায়ী ক্লিনার। প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তার গাড়ি চালক মো. স্বপন। তিনি নিয়োগ পেয়েছিলেন দারোয়ান হিসেবে। 

ঝাড়ুদার হিসেবে কেসিসিতে নিয়োগ পান আফজাল হোসেন খোকন ও আনোয়ার হোসেন। তারা এখন গ্যারেজ শাখার স্টিমরোলার (সড়ক সংস্কারের জন্য ব্যবহৃত যান) ও সাধারণ রোলার চালাচ্ছেন। নর্দমা শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মো. আশিক ও নাসিম শেখ। তারাও এখন রোলার চালাচ্ছেন। 

এ প্রসঙ্গে যান্ত্রিক বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী সেলিমুল আজাদ বলেন, বিভিন্ন শাখায় নিয়োগ হলেও চালক হিসেবে তারা অভিজ্ঞ। পরীক্ষা দিয়ে তারা হালকা যান চালানোর লাইসেন্স পেয়েছেন। দীর্ঘদিন চালক হিসেবে অভিজ্ঞ হওয়ায় তাদের প্রশাসকসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার গাড়ি ও যন্ত্র চালাতে দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের কারও ভারী যান চালানোর লাইসেন্স নেই।

আরও পড়ুন

×