অবহেলা আর বঞ্চনা নিত্যসঙ্গী
নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের বিশপনগর গ্রামে জরাজীর্ণ ঘর সমকাল
মিজানুর রহমান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)
প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘ধান পাকতে আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগবে। কিন্তু ক্ষেতের পাশের জঙ্গলে ৪০-৪৫টি বন্য আত্তি (হাতি) অবস্থান করছে। রাইত (রাত) বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্তিরপালের অত্যাচার বাইড়া যায়। ক্ষেতে হানা দিতে চায় তারা। আত্তির ডরে রাইতে (রাতে) ঘুম আসে না।’ সমকাল প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে কথাগুলো বলছিলেন কিষানি রোজিনা চিছাম।
বন্যহাতি ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে আদিবাসী পরিবারগুলো। তাদের কেউ কেউ দিনমজুরি, পাথর শ্রমিক ও বন থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে বিক্রি করে থাকেন। আবার কেউ জীবিকার তাগিদে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছেন। অভাব-অনটনে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করলেও তাদের দিকে বিশেষ নজর নেই কারও। অবহেলিত এই গারো সম্প্রদায়ের অন্তত ৬০টি পরিবারের বসবাস নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের বিশপনগর গ্রামে। সদস্য সংখ্যা দুই শতাধিক। তাদেরই একজন রোজিনা চিছাম।
রামচন্দ্রপুরা ইউনিয়নের সীমান্ত সড়কের বাংলার মোড় থেকে দেড় কিলোমিটার উত্তর দিকে গেলেই চোখে পড়ে পানিহাটা পাদ্রি মিশন। মিশনের সামনের একটি সরু সড়ক দিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার গেলে ভারত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি গ্রাম বিশপনগর। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ যেতে চান না গ্রামটিতে। ছোট ছোট পাহাড় ও টিলায় ঘেরা গ্রামে দিন দিন জনসংখ্যা বাড়লেও তাদের ভাগ্যের বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি।
বাসিন্দারা জানান, গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভোগাই নদী দিয়ে এক সময় ভারত থেকে ভেসে আসত অসংখ্য মূল্যবান গাছ। সেসব গাছ তুলে নিয়ে বিক্রি করে এবং পাহাড়ের সমতল জমিতে ধান চাষ করে ভালোই চলত বিশপনগর গ্রামের গারোদের সংসার। এসব দৃশ্য এখন শুধুই স্মৃতি।
গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। কিন্তু তাতেও ভাগ বসায় হাতি। প্রতিবছর ধান পাকার সময় হলে হাতির পাল হামলে পড়ে। ফসল বাঁচাতে দিন-রাত যুদ্ধ করতে হয় এখানকার মানুষকে। তাদের মূল পেশা কৃষিকাজ হলেও পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়ায় জমি সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকেই ভিন্ন পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
গ্রামটিতে কোনো পাকা সড়ক নেই। তবে কিছু দিন আগে গ্রামে যাতায়াতের জন্য অল্প একটু পাকা সড়ক করা হলেও বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বেহাল হয়ে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে সড়ক ধুলোময় হয়ে থাকে। বর্ষায় চলাচল সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ ছাড়া গ্রামে একটি মাত্র প্রাক্-প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সেটি কয়েক বছর ধরে বন্ধ। প্রাথমিক এবং উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। এই গ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার হার নাজুক। স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও বেহাল। কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পায় না গারো পরিবারগুলো। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বারোমারি খ্রিষ্টানপল্লীর দাতব্য হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হয় তাদের। মুমূর্ষু রোগীকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নালিতাবাড়ী উপজেলা সদর অথবা ৪০ কিলোমিটার দূরে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়।
গ্রামটিতে বসবাসের জন্য ৪২টি পাকা ঘর রয়েছে। হাতির আক্রমণ থেকে জানমাল রক্ষায় ময়মনসিংহ ধর্ম প্রদেশের বিশপ ২০১০ সালে বিশপনগর পল্লিতে ৩৪টি সুরক্ষা ঘর নির্মাণ করে দেন। ২০১১ সালে আরও ১৪টি ঘর নির্মাণ করে দেয় ময়মনসিংহ কারিতাস। তৎকালীন নালিতাবাড়ী টিডব্লিউএ চেয়ারম্যান মি. লুইস নেংমিনজাকে ঘরগুলো নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
উপকারভোগীদের অভিযোগ, ঘরগুলো নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। নির্মাণের পর থেকে মেরামত ও সংস্কার না করায় দেয়ালে ফাটল ধরেছে। অনেক ঘর ঝুঁকিপূর্ণ। বাসিন্দা দর্পণ সাংমা, জাস্টিনা স্নাল ও মদিন চিরানের ভাষ্য, প্রতিবছর পাহাড় থেকে হাতির পাল নেমে আসে বাড়িঘরে। হাতির আক্রমণ থেকে তাদের বাঁচতে পাকা ঘর করে দিয়েছেন বিশপ। কিন্তু যারা ঘরগুলো নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন, তারা সঠিকভাবে নির্মাণ করেননি, যার জন্য ঘরগুলোতে ফাটল ধরেছে। যে কোনো সময় এগুলো ধসে পড়তে পারে, এজন্য তারা পরিবার নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন। তবে ঘর নির্মাণে দায়িত্বে থাকা ও সাবেক টিডব্লিউএ চেয়ারম্যান মি. লুইস নেংমিনজা বলেন, অল্প বাজেটে এতগুলো ঘর নির্মাণ করায় তা মজবুত করা যায়নি।
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, মাঝেমধ্যেই হাতি হানা দেয় এই গ্রামে। কাঁঠাল ও ধান পাকার মৌসুমে হাতির পাল খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসে। এই সময় হাতির পাল কাঁঠাল, ক্ষেতের ধান খেয়ে ও পা দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করে। বাড়িঘর ভেঙে তছনছ করে ফেলে। তখন এই অসহায় গারোদের টিন পিটিয়ে, মশাল জ্বালিয়ে, ডাকচিৎকার ও হৈ-হুল্লোড় করে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। বসবাসের ঘরগুলোর দেয়ালেও বড় আকারের ফাটল ধরে গেছে। জরাজীর্ণ এসব ঘরে বসবাস রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ। পরিবার নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন তারা। তাদের ভালো-মন্দের খবর কেউ রাখেন না।
ইউএনও ফারজানা আক্তার ববি বলেন, ‘ঘরগুলো যেহেতু বেসরকারি উদ্যোগে করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার তেমন সুযোগ নেই। তবে তাদের অন্যান্য সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আবেদন সাপেক্ষে সহায়তা করা হবে।’
- বিষয় :
- অবহেলা
