ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সৌরভে মুগ্ধ ফরিদপুর

সৌরভে মুগ্ধ ফরিদপুর
×

আহমেদ সৌরভ

হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

নাম আহমেদ সৌরভ (২৫)। ছাত্রজীবন থেকেই স্বেচ্ছাসেবী। বর্তমানে চিকিৎসক। ১১ বছর ধরে মানুষের সেবা করে চলেছেন আপন মনে। ফরিদপুরের নাগরিক মননে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন এই যুবক। 

সদিচ্ছা আর মনোবল নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতীক যেন সৌরভ ও তাঁর সংগঠন ‘আমরা করবো জয়’। সামাজিক কাজ করার পাশাপাশি ফেসবুকে চিকিৎসা-সংক্রান্ত ভিডিও তৈরি করেন তিনি, যেখানে প্রায় এক লাখ ৫৩ হাজার ফলোয়ার। ২০১৫ সালে ছাত্রজীবন থেকেই কিশোর সৌরভের মন কাঁদত আশপাশের মানুষের কষ্টে। আর্তমানবতার সেবা সেই শুরু; আজ সৌরভে মাতোয়ারা ফরিদপুর।

এ পর্যন্ত ফরিদপুর শহর ও আশপাশের ৩৫টি গৃহহীন ভাসমান পরিবারকে থাকার ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন সৌরভ ও তাঁর বন্ধুরা। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান সহযোগী ফেসবুক বন্ধুরা। ছয়জন মাঝিকে কাঠের নৌকা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে; ছয়জনকে রিকশা ও পাঁচজনকে ভ্যান কিনে দেওয়া হয়েছে, যেগুলো চালিয়ে তারা আজ স্বাবলম্বী। কর্মসংস্থান করে দিয়েছেন ৫৩ জনকে, দরিদ্র পরিবারের দুজন মেয়েকে বিয়ে দিতে সহযোগিতা করার পাশাপাশি প্রায় চার হাজার ব্যাগ রক্ত জোগাড় করে দিয়েছেন হাসপাতালে সাহায্যপ্রার্থী রোগীদের। সৌরভ নিজেও ২০ বার রক্ত দিয়েছেন। জন্মগত হার্টে ছিদ্র ছয়টি দরিদ্র পরিবারের শিশুকে অস্ত্রোপচারের জন্য পুরো আর্থিক সহযোগিতা করেছেন তারা। মাঝেমধ্যে রাতে পথচারী, মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয় ‘আমরা করবো জয়’-এর উদ্যোগে। বছরে একবার ‘ফুচকা উৎসব’ করা হয়, যেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে একজনকে স্বাবলম্বী করতে তুলতে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া হয়।

করোনা মহামারির মধ্যে মানুষকে খাদ্য সহযোগিতা, অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে রাস্তা থেকে তুলে এনে চিকিৎসা দেওয়া, প্রতি শীতে শীতার্ত মানুষের মধ্যে লেপ ও গরম কাপড় বিতরণ করেছেন সৌরভ, যার প্রকৃত পরিসংখ্যান তাঁর কাছেও নেই। তিনি বলেন, ‘আমি ভালো লাগা ও আত্মতৃপ্তির জন্য এসব করি। সামাজিক দায়বদ্ধতার কারণে করি। হিসাব রাখার কথা তখন মনে থাকে না।’ 
সৌরভ বলেন, শহরতলির ডিক্রীরচরে এতিম বাচ্চাদের পড়াশোনা ও থাকার জন্য আবদুস সালাম এতিমখানা নামে ২০২৩ সালে একটি এতিমখানা করেছি। ১৫ জন এতিম বাচ্চা সেখানে থেকে পড়াশোনা করে। সহজে বাসা ভাড়া দেওয়া-নেওয়ার জন্য হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ করেছি; সময়মতো সবাই সহায়তার টাকা পঠিয়ে দেন।

স্বেচ্ছাসেবায় উপকৃত মানুষের খোঁজে আহমেদ সৌরভকে নিয়ে সম্প্রতি গেলাম শহরের লক্ষ্মীপুর রেলস্টেশন এলাকায়। স্টেশনের শেষ প্রান্তে ঝোপঝাড়ে ঘেরা একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকলাম। ভেতর থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব এক নারী বের হয়ে এলেন। নাম খাদিজা বেগম। স্টেশনের আশপাশেই চেয়ে-চিনতে চলে তাঁর দিন। সাত বছর আগে তাঁকে একটি ঘর বানিয়ে দেন সৌরভরা। অনেক দিন পর তাঁকে দেখেই চিনতে পারলেন খাদিজা। ফিরে আসার সময় তিনি বললেন, ‘তোরা তো ঘর করে দিছিস, আর কী দিবি। সৌরবিদ্যুতের ব্যাটারিটা চোরে নিয়ে গেছে। পারলে একটা ব্যাটারি লাগিয়ে দিস।’
‘আমরা করবো জয়’ সংগঠনের সভাপতি আহমেদ সৌরভ। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন আরেক মানবিক তরুণ শরীফ খান। তিনি বলেন, ২০১৫ সালে ফেসবুকে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী আহমেদ সৌরভের মানবিক কাজগুলো দেখতাম। ছোট একটা মানুষ, তার অসাধারণ চিন্তা এই সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিয়ে। সেখান থেকেই আহমেদ সৌরভের প্রতি ভালোলাগা শুরু। ২০১৬ সালে ‘আমরা করবো জয়’ নামে শুরু হয় সাংগঠনিক কাজ।
ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আলতাফ হোসেন। গত এক যুগে সৌরভের এই জনহিতকর কাজের তিনি একজন সাক্ষী। তিনি বলেন, সৌরভের কাজ এবং চিন্তা সব সময়ই মানবিক। আসলে চেষ্টা আর সদিচ্ছা থাকলেই আশপাশের মানুষকে একটু ভালো থাকার খোরাক জোগানো যায়। সমাজে ওদের মতো ছেলেমেয়ের খুবই প্রয়োজন।

আহমেদ সৌরভের বাবা আবদুস সালাম সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন; অবসরে গেছেন এক বছর আগে। মা শিউলি আক্তার গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের সবার বড় সৌরভ। ফরিদপুর ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস করা  সৌরভ বলেন, স্বপ্ন দেখি একটি হাসপাতাল তৈরি করার, যেখানে সব ধরনের চিকিৎসা পাবে অসহায় মানুষ। ইচ্ছা আছে, বাংলাদেশের চিকিৎসা সেক্টরের উন্নয়নে কাজ করার।

 

আরও পড়ুন

×