চলনবিলে শুঁটকির মহাযজ্ঞ
শুঁটকির চাতালে কাজ করছেন দুই নারী শ্রমিক। সম্প্রতি চলনবিলের তাড়াশের মহিষলুটি এলাকা থেকে তোলা সমকাল
এম. আতিকুল ইসলাম বুলবুল, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষায় বিলের পানিতে ছলছল করে ওঠে হাজারো ছোট মাছ, সেই মাছ ঘিরে পেশা ও জীবিকার সূত্রে আঁকড়ে ধরেন এখানকার মৎস্যজীবীরা। আশ্বিন থেকে মাঘ; প্রাণ ফিরে পায় বিলসংলগ্ন শুঁটকির চাতালগুলো। সূর্যের উজ্জ্বল রোদে চাতালজীবন হয়ে ওঠে এক অনন্য মহাযজ্ঞ।
চলনবিল অঞ্চলের ৭০ থেকে ৮৫ জন মৎস্যজীবী-ব্যবসায়ী বছরের এই সময়টিতে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ দিয়ে তৈরি করেন স্বাস্থ্যসম্মত, বিশুদ্ধ শুঁটকি। তাদের শ্রমে গড়া এই পেশাই আজ বহু পরিবারকে করেছে স্বাবলম্বী। সংসার চলে, সন্তানদের লেখাপড়া হয়, গৃহস্থালির স্বপ্ন বড় হয়–সবই রোদে শুকানো মাছের মতোই ধীরে ধীরে পুষ্ট হয়ে ওঠে।
পলান প্রামাণিক: ছয় দশকের শুঁটকিগাথা
পাবনার চাটমোহরের হান্ডিয়াল পূর্বপাড়ার প্রবীণ মৎস্যজীবী পলান প্রামাণিক আজও জীবন্ত ইতিহাস। ৬০ বছর তিনি ধরে রেখেছেন চলনবিলের শুঁটকির ঐতিহ্য। যৌবনে নীলফামারীর সৈয়দপুরের এক শুঁটকি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে শেখা এই শিল্পই বদলে দিয়েছে তাঁর জীবন।
অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে মাছ নষ্ট হয়ে যেত! সেই ব্যবসায়ীর পরামর্শে পলান সস্তায় মাছ কিনে রোদে শুকিয়ে বিক্রি করতে শুরু করেন। প্রথম বছরেই লাভ আসে। তারপর আর থামেনি পলানের স্বপ্ন। শুঁটকির চাতাল বড় হয়েছে, সংসারও হয়েছে সচ্ছল।
বাবার পথ ধরে মোফাজ্জল হোসেন প্রামাণিকও তিন দশক ধরে শুঁটকিকে পেশা মানতে দ্বিধা করেননি। বাবার শেখানো কৌশল, শুঁটকি তৈরির অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে তিনিও আজ স্বাবলম্বী।
আষাঢ় থেকে ভাদ্র: শুরু হয় জীবনের উন্মেষ
আষাঢ়ে আকাশে যখন মেঘ জমে, তখন থেকেই শুরু হয় শুঁটকি মৌসুমের প্রস্তুতি। বাঁশের বানা, খুঁটি, মাছঘর, ডালা, হাতা, টুপড়ি–সব সাজানো হয় যত্নে। ভাদ্রের মাঝামাঝি অপেক্ষাকৃত উঁচু কোনো স্থানে শুরু হয় চাতাল বসানোর আয়োজন।
কিছুদিন পর যখন বাজারে দেশি মাছের জোয়ার আসে–পুঁটি, ট্যাংরা, টাকি, বোয়াল, শোল, খলিশা, চান্দা, গুচি, ইছা–তখনই শুরু হয় শুঁটকি তৈরির মহাযজ্ঞ। দলে দলে নারী-পুরুষ শ্রমিক আসেন বিলের কাদা ঠেলে, মাথায় ডালা, হাতে ছুরি ও বঁটি। কেউ মাছ কাটেন, কেউ লবণ মেশান, কেউবা কাঠের হাতায় বড় বানার মাছ নেড়ে দেন, যাতে রোদ সমানভাবে লাগে।
একটি মাঝারি চাতালে মৌসুমে ৩০০ থেকে ৩৫০ মণ শুঁটকি তৈরি হয়। এতে শত শত মানুষের শ্রম রয়েছে। মহিষলুটি, খলিশাগাড়ী, বিলসা, সলঙ্গা, চারঘাট, সিংড়াদহ এলাকার বাজার থেকেই কেনা হয় শুঁটকির উপযোগী মাছ। প্রতি মণ মাছ সিমেন্টের চাড়িতে লবণ মিশিয়ে ভিজিয়ে রাখা হয় ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। ৪ কেজি মাছ শুকিয়ে হয় মাত্র ১ কেজি শুঁটকি। তারপর রোদে পাততে পাততে দিনের পর দিন তৈরি হয় সুগন্ধি দেশীয় শুঁটকি।
উৎপাদনের চিত্র
গত দুই বছরের সরকারি তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে তাড়াশ–৩০০ টন, উল্লাপাড়া–৭৮০, চাটমোহর–১৩৮, গুরুদাসপুরে ১২১ টন শুঁটকি উৎপাদন হয়। ২০২৪ সালে তাড়াশ–৩১০ টন, উল্লাপাড়া–৬৮০, চাটমোহর–১১৩, গুরুদাসপুর–১০২ টন এবং ২০২৫ সালে অক্টোবর মাস পর্যন্ত অর্ধশতাধিক চাতালে শুঁটকি উৎপাদন শুরু হয়েছে, যেখানে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ শ্রমিক কাজ করছেন। পুরুষ শ্রমিক পান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, নারী শ্রমিক ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, সঙ্গে একবেলার খাবার ও যাতায়াত খরচ।
বর্তমান বাজারে মণপ্রতি শুঁটকির গড় দাম: পুঁটি–১২,০০০ থেকে ১৪,০০০, বোয়াল–৮০,০০০ থেকে ৯৫,০০০, টাকি–৫৫,০০০ থেকে ৬০,০০০, খলিশা–১৫,০০০ থেকে ১৬,০০০, গুচি–৪০,০০০ থেকে ৪৫,০০০, ইছা–২৮,০০০ থেকে ৩২,০০০ টাকা।
দশ বছর আগে যেখানে ৫-৬ লাখ টাকা পুঁজি লাগত, এখন শ্রমিক, উপকরণ ও মাছের দাম বাড়ায় একটি বড় চাতালে পুঁজি লাগে ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা। ভালো মৌসুমে লাভ পাওয়া যায় ৪-৫ লাখ টাকা, তবে বৃষ্টি বা রোদ কম হলে পচে-নষ্ট হয়ে লোকসানও হয়। তবু ঝুঁকি নিয়েই চলছে এই শিল্প– কারণ, এটি শুধু ব্যবসা নয়, চলনবিলের মানুষের বেঁচে থাকার এক অংশ।
স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার
শুঁটকি কেবল সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর কিংবা নীলফামারী, রংপুরেই সীমাবদ্ধ নয়, আড়তদারদের হাত ধরে এটি পাড়ি দেয় দেশের সীমানা পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও। সেখানে চলছে বিলের শুঁটকির সুনাম।
তাড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোকারম আলীর ভাষায়, ‘শুঁটকির চাতাল শুধু পরিবারকে স্বাবলম্বী করছে না; স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।’
- বিষয় :
- নারী শ্রমিক
