ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আলিমের ‘সর্বদা সহানুভূতি’

আলিমের ‘সর্বদা সহানুভূতি’
×

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বারুহাটি গ্রামের আবদুল আলীমদের অ্যাম্বুলেন্স সেবা -সমকাল

কিশোর কুমার, সাতক্ষীরা

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাতক্ষীরা শহরে এক রাস্তার পাশে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে ছিলেন এক ঠিকানাহীন নারী। আঘাত থেকে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে পায়ে পচন ধরেছে। আসা-যাওয়ার পথে অনেকেই অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা হৈমন্তীকে দেখেও সাহায্য করতে এগিয়ে যাননি। একমাত্র ব্যতিক্রম তালা উপজেলার বারুহাটি গ্রামের আবদুল আলীম। ৪৫ বছর বয়সী ওই নারীকে তুলে নিয়ে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন তিনি। 

হাসপাতালে এক মাস চিকিৎসা শেষে নিজ বাড়িতে নিয়ে আরও চার মাস সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন হৈমন্তীকে। আশপাশের পরিচিত বিত্তবানের সহযোগিতায় কৃত্রিম পায়ের ব্যবস্থাও করে দেন। পরে এক সরকারি কর্মকর্তার মাধ্যমে হৈমন্তীর আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন আলীম।
হৈমন্তীর পাশে দাঁড়াতে গিয়ে মানবসেবার যে আত্মতৃপ্তি আলীম খুঁজে পান, তা আসলে ছিল এমন এক উদ্যোগের সূচনা, যা তাঁকে করে তুলেছে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অন্যতম ভরসাস্থল। ২০১৯ সালের নভেম্বরে আবদুল আলীমসহ সাতজন মিলে মানবসেবার উদ্দেশ্যে সাতক্ষীরার তালায় গড়ে তোলেন সামাজিক সংগঠন ‘সহানুভূতি’। পরে সংগঠনের নাম পাল্টে হয় ‘সর্বদা সহানুভূতি’। এরপর স্বেচ্ছায় সংগঠনটিতে আরও ৩০ সদস্য যোগ দেন। এখন তাদের অনেকে নিষ্ক্রিয় হলেও আবদুল আলীমসহ হাতেগোনা কয়েকজন ছুটে বেড়ান মানবতার সেবায়।

সংগঠনের তথ্য বলছে, ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৫২০ জন অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে তারা। ১১০ জন ভবঘুরে, মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে চিকিৎসা শেষে তাদের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রক্তদান, বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা, শীতবস্ত্রদান ও দরিদ্র মানুষকে আর্থিক সহায়তা মিলিয়ে জেলার প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে সহযোগিতা করেছে সংগঠনটি। তাদের এ কাজে সহায়তা করেন স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী ও কয়েকজন চাকরিজীবী। তবে ‘সহানুভূতি’র যে উদ্যোগটি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে, সেটি তাদের বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা। 

সংগঠন পরিচালনা
আবদুল আলীম জানান, ঘুরে ঘুরে মানুষকে সেবা দেওয়া কষ্টকর। অনেকে সন্দেহের চোখে দেখত। স্বেচ্ছাসেবীরাও বিভ্রান্তিতে পড়ত। সেই ভাবনা থেকেই তিনি নিজের ১১ লাখ টাকার জমি বিক্রি করেন। তারপর ২০২০ সালে নিজের আরেকটি জমিতে সংগঠনের জন্য তৈরি করেন দুই কক্ষের টিনশেড ঘর। স্থানীয় বিত্তশালীরাও সহযোগিতা করেন। এভাবেই স্থায়ী ঠিকানা পায় ‘সহানুভূতি’। 

বর্তমানে ঘরের একটি কক্ষ অফিস, অন্যটি ভবঘুরে মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অফিসের সামনে খালি জায়গায় লাগানো হয়েছে বিভিন্ন গাছ। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে সেবা। অফিসে সাতজন স্বেচ্ছাসেবী থাকলেও আলীম ও তাঁর সহযোগী নাসির উদ্দীন সব দেখাশোনা করেন।

আলীম আরও জানান, নিজের ১০ বিঘা কৃষিজমির আয় দিয়ে চলে তাঁর সংসার। সেই আয়ের একটি বড় অংশ সংগঠনের পেছনে ব্যয় করেন, বাকিটা বিত্তবানদের সহযোগিতা। বিনা বেতনে এখানে কাজ করেন স্বেচ্ছাসেবকরা। প্রতি মাসে অ্যাম্বুলেন্সের তেল, চালকের বেতন মিলিয়ে খরচ হয় ২০-২৫ হাজার টাকা। পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতায় খরচ হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। 

একটি অ্যাম্বুলেন্স, একটি নম্বর
একসময় অসুস্থ, ভবঘুরে মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হতো। জরুরি প্রয়োজনে রোগীকে হাসপাতালে নিতে সময়মতো অ্যাম্বুলেন্স পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। এসব পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আলীম। নিজের জমানো ও সহযোগিতা নিয়ে এ বছরের শুরুতে ৯ লাখ টাকা দিয়ে কেনেন পুরোনো একটি অ্যাম্বুলেন্স। সেটি দিয়েই তারা সাতক্ষীরা এলাকায় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। অ্যাম্বুলেন্সের হটলাইন নম্বরে (০১৭১০-৬১৫৫৩২) কেউ ফোন করলে ছুটে যান তারা। যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের কাছ থেকে অ্যাম্বুলেন্স সেবা বাবদ নেওয়া হয় নামমাত্র টাকা। দরিদ্রদের এই সেবা মেলে বিনামূল্যে। 

আলীমকে নিয়ে গর্বিত গ্রামবাসী ও পরিবার 
মানবসেবায় আবদুল আলীমের কার্যক্রমে শুধু বারুহাটি গ্রাম নয়; তালার মানুষও গর্বিত। আলীমের স্ত্রী-সন্তানরাও তাঁকে নিয়ে গর্ব করেন। স্ত্রী সুমি খাতুন বলেন, অভাব-অনটনের সংসারে শুরুতে আমি আলীমের এসব কাজের প্রতি বিরক্ত ছিলাম। পরে মানুষের প্রতি মহানুভবতা দেখে আমিও মানিয়ে নিই। তাঁকে নিয়ে এখন আমার গর্ব হয়। 

সেবা পাওয়া তালা উপজেলার খেরশা গ্রামের দরিদ্র আছমাতুল্লাহ খাতুন জানান, ২০২৪ সালের শেষের দিকে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। টাকার অভাবে চিকিৎসা চালানো কঠিন ছিল। একদিন গভীর রাতে গুরুতর অসুস্থ হলে উপায় না পেয়ে ‘সহানুভূতি’র অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করলে তাঁকে বিনামূল্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, এর পর সংগঠন সহানুভূতি ও সমাজের বিত্তবানের সহযোগিতায় ঢাকায় গিয়ে কয়েক মাস ধরে উন্নত চিকিৎসা নেন। সবার সহযোগিতায় তিনি এখন অনেকটা সুস্থ। 

উপজেলার কপিলমুনি এলাকার আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, কয়েক মাস আগে সন্ধ্যায় তালা সেতু-সংলগ্ন এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় রাস্তার পাশে পড়ে ছিলেন তিনি। স্থানীয়রা আলীমের অ্যাম্বুলেন্সে খবর দিলে তাঁকে বিনামূল্যে হাসপাতালে পৌঁছে দেন তারা। 
তালা শহীদ কামেল মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক জাহিদুর রহমান বলেন, সহানুভূতি সংগঠনের আলীম শুধু অসুস্থদের চিকিৎসাসেবা নয়; যে কোনো মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি প্রতিনিয়ত উপজেলার শত শত মানুষকে সহযোগিতা করে চলেছেন। তাঁর এ কার্যক্রমে আমরা তালাবাসী গর্বিত।  

স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টিতে আবদুল আলীম
তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. খালিদ হাসান নয়ন বলেন, আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করতে ‘সহানুভূতি’ কাজ করে যাচ্ছে। এ সংগঠনের কাজ হচ্ছে সমাজের দরিদ্র ও উদ্বাস্তু মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার জন্য হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া। 
সদ্য বিদায়ী তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপা রানী সরকার বলেন, ‘সহানুভূতি’ দীর্ঘদীন মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এতিম ও ছিন্নমূল শিশুদের জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করে তারা। 

 

আরও পড়ুন

×