ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সৎকারে চট্টগ্রামের গাউছিয়া কমিটি

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সৎকারে চট্টগ্রামের গাউছিয়া কমিটি
×

কাদা-পানি মারিয়ে কাঁধে করে লাশ শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছেন গাউছিয়া কমিটির সদস্যরা -সমকাল

নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২০ | ০৮:৩৭

তিন মাস বয়সের ইশা শীল গত ৩ জুলাই করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যায় চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে। শিশুটিকে সৎকারের জন্য ইসলাম ধর্মীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গাউছিয়া কমিটির সহযোগিতা চায় পরিবার। গাউছিয়া কমিটি চট্টগ্রাম মহানগর চান্দগাঁও কমিটির স্বেচ্ছাসেবী মোহাম্মদ হোসেন খোকনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দল ইশাকে হাসপাতালের আইসিইউ থেকে বের করে শেষ গোসল দেয়, শেষযাত্রার পোশাক পরিয়ে গাউছিয়া কমিটির অ্যাম্বুলেন্সে করে পটিয়ার কেলিশহরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে ধর্মীয় রীতিতে ইশাকে এলাকার শ্মশানে দাহ করে তার পরিবার।

গত ৩ আগস্ট রাতে নগরীর একটি হাসপাতালে (সার্জিস্কোপ হাসপাতাল) মারা যান রাউজানের গশ্চি এলাকার বাসিন্দা অনিল দাশ (৭১)। তাকেও সংগঠনের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামে নিয়ে যান গাউছিয়া কমিটির সদস্যরা, সৎকারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেন।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গে মৃত মুসলমানদের দাফনের পাশাপাশি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সৎকারে সহযোগিতা করে 'শেষযাত্রায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি'র অন্যরকম দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে চট্টগ্রামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গাউছিয়া কমিটি। সংগঠনটি এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গে মৃত নারীসহ ৯ জন হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর সৎকারে সহযোগিতা করেছে। 

কমিটির স্বেচ্ছাসেবীরা কারও লাশ হাসপাতাল থেকে বাড়ি পৌঁছেদিয়েছেন, কাউকে শেষ গোসল দিয়ে পোশাক পরিয়েছেন, আবার কাউকে কাঁধে করে চিতায়ও নিয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, এ পর্যন্ত শতাধিক ভিন্ন ধর্মাবলম্বী করোনা রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন, গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় অক্সিজেন সরবরাহ করেছেন তারা।

প্রসঙ্গত, গত ১৩ এপ্রিল থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত গাউছিয়া কমিটির স্বেচ্ছাসেবীরা সারাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গে মৃত ৭৫৮ জনের লাশ দাফন ও সৎকারে সহযোগিতা করেছেন। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ২৮০। সারাদেশে নারীদের দাফনে গাউছিয়া কমিটির ১২০ জনের একটি নারী স্বেচ্ছাসেবী দলও আছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী এ ব্যাপারে বলেন, 'সব ধর্মেরই মূল কথা হলো মানবসেবা। করোনা মনুষ্যত্বকে নতুনভাবে জাগ্রত করেছে, মানুষ এখন অনেক বেশি মানবিক। গাউছিয়া কমিটি ঐশীপ্রেমে বলীয়ান একটি সংগঠন।সকরোনা দুর্যোগে সংগঠনের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভুলে যেভাবে মানবসেবা করে যাচ্ছে তা তুলনাহীন। '

করোনা উপসর্গে মৃত তিন মাস বয়সী ইশা শীলের মা পটিয়ার কেলিশহরের বাসিন্দা টুম্পা শীল বলেন, 'আমার কলিজার টুকরোটাকে আমার সামনেই অনেক যত্ন করে গোসল করিয়ে পোশাক পরিয়ে দিয়েছেন গাউছিয়া কমিটির সদস্যরা। তাদের কোলে করে আমার দুধের বাচ্চাটা শেষবারের মতো বাড়ি ফিরেছে। তাদের কোলেই মেয়েটাকে শেষবারের মতো আদর করেছি। আমার বাচ্চার সৎকারে গাউছিয়া কমিটির সদস্যরা যে সহযোগিতা করেছেন তা কখনোই ভুলব না।'

বাঁশখালীর শীলকুপ গ্রামের দাশপাড়ার বাসিন্দা অমেন্দ্র বিকাশ দাশ (৬৫) করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০ জুলাই নগরীর একটি হাসপাতালে মারা যান। গাউছিয়া কমিটির শহরের স্বেচ্ছাসেবীরা তার গ্রামে লাশ নিয়ে যান। গাউছিয়া কমিটি দক্ষিণের সভাপতি আবু বক্কর সিকদার ও উত্তরের সভাপতি আবদুর রহিম সিরাজীর নেতৃত্বে একদল স্বেচ্ছাসেবী অমেন্দ্রর লাশ শেষ গোসল শেষে শ্মশানে নিয়ে যান। পরে ধর্মীয় রীতিতে লাশ সৎকারের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে মৃতের পরিবার।

অমেন্দ্র বিকাশ দাশের ছেলে জয়েশ দাশ সমকালকে বলেন, 'আমাদের বাড়ি থেকে শ্মশানের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। শ্মশানে যেতে হয় কর্দমাক্ত রাস্তা ও ধানি জমির আইল দিয়ে। গাউছিয়া কমিটির স্বেচ্ছাসেবীরা হাঁটু পরিমাণ কাদা মাড়িয়ে আমার বাবার লাশ শ্মশানে নিয়ে গেছেন। ভিন্ন ধর্মের মানুষগুলো যে মানবিকতা দেখিয়েছে তা আমাদের কাছে অমর স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমরা গাউছিয়া কমিটির কাছে চিরকৃতজ্ঞ। '

গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মোসাহেব উদ্দিন বখতিয়ার বলেন, 'ইসলামের শিক্ষা হলো সেবা ও বিচারের ক্ষেত্রে সব মানুষের অধিকার সমান। এখানে ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই। আমরা ইসলামের সুমহান এই শিক্ষা আত্মস্থ করে করোনাকালে সব ধর্মের মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা মুসলমানদের লাশ দাফন করছি, আবার যার যতটুকু চাওয়া সেই মোতাবেক হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সৎকারেও সহযোগিতা করছি। আমরা কারও কাছ থেকে এক টাকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াও নিই না। এটা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রম। সারাদেশে চার শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী চার মাস ধরে এই কাজ করে যাচ্ছেন।'

আরও পড়ুন

×