ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তিস্তার চরে স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা

তিস্তার চরে স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা
×

তিস্তার চরে মিষ্টিকুমড়া ক্ষেতের পরিচর্যা করছেন কৃষক। সম্প্রতি রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মর্ণেয়া ইউনিয়নের ছোট রুপাই এলাকায় তোলা -সমকাল

স্বপন চৌধুরী, রংপুর

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৩০ | আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১১:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

খরস্রোতা তিস্তা নদীতে এখন পানি নেই। জেগে উঠেছে চর-ডুবোচর। বন্যায় ঢলের সঙ্গে আসা পলিতে উর্বর হয়েছে চরের জমি। আর সেখানেই অক্লান্ত পরিশ্রম করে আলু, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, সরিষা, গম, ভুট্টা, চীনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচসহ নানা ধরনের শাকসবজি ফলাচ্ছেন কৃষকরা। শুকনো মৌসুমে রবি ফসল আবাদ করে চলে জীবন-জীবিকা। এতে কিছুটা দুঃখ ঘোচে বন্যায় সর্বস্বান্ত হওয়া রংপুরের চরের কৃষকদের।

সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর এলাকায় নির্মিত ৮৫০ মিটার সেতুর মাত্র ৬০ মিটার অংশ দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। জেগে ওঠা চরে কৃষকরা শাকসবজি আবাদ করছেন। 

গঙ্গাচড়ার মর্ণেয়া ইউনিয়নের ছোট রুপাই ও গজঘণ্টা ইউনিয়নের ছালাপাক এলাকায় বিস্তীর্ণ চরে আবাদ হচ্ছে মিষ্টিকুমড়া। লক লক করে বেড়ে ওঠা কুমড়ার ডগায় ঢাকা পড়েছে বালুচর। প্রতিটি কুমড়ার বেডের মাঝখানে ফাঁকা রেখে সেখানে সাথি ও মিশ্র ফসল হিসেবে বপন করা হয়েছে পেঁয়াজ, রসুন, লালশাক ও লাউয়ের বীজ।

শীতের বিকেলে ছোট রুপাই এলাকায় নাতিকে নিয়ে কুমড়া ক্ষেতের পরিচর্যা করছিলেন হালিমা বেগম। দুই বিঘা জমিতে মিষ্টিকুমড়া চাষ করেছেন তিনি। হালিমা বলেন, ‘চরোত এমতন (এমন) করি আবাদ করিতো কোনো মতন বাঁচি আচি। অপেক্ষায় থাকি, বানের পানি কখন নামি যায়।’ পরিবারের সবাই মিলে ফসল চাষে সারাদিন নিজেরাই শ্রম দেন বলে জানান তিনি। 

ওই চরে তিন বিঘা জমিতে মিষ্টিকুমড়া চাষ করেছেন আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘গত বছর আলু আবাদ করি লোকসান হইচে। সেইবাদে এবার সবার আগোত কুমড়া নাগাচি, দেকি আল্লায় কী করে।’

৬৭ চরে চলছে আবাদ
কৃষি বিভাগ জানায়, রংপুরের গঙ্গাচড়া, পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার ৬৭টি চরের অন্তত আট হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে। প্রতিবছর ভুট্টা, গম, বাদাম, তিল, তিসি, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, বেগুন, করলা, সরিষা, সূর্যমুখী, গাজর, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন শাকসবজি উৎপাদন হচ্ছে সোয়া লাখ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তিন উপজেলায় তিস্তার ৩০০ হেক্টর জমিতে মিষ্টিকুমড়া আবাদ হয়েছে। অন্যান্য ফসল আবাদের প্রস্তুতি চলছে। তিস্তায় সাধারণত সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে পানি কমে চর জেগে উঠতে শুরু করে। সেখানে অক্টোবর-নভেম্বর থেকে আবাদ শুরু হয়। মিষ্টিকুমড়া ওঠার পর লাউ চাষ করেন কৃষকরা। মার্চে শেষ ফসল তোলা হয়। এরপর মে-জুন থেকে ডুবতে থাকে চর।

গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের মহিপুরে তিস্তা সেতু এলাকাতেও রবি ফসল চাষ চলছে। কুমড়া চাষে কেউবা গর্ত তৈরি করে বালু সরিয়ে সেখানে বাইরে থেকে আনা পলিমাটি ও জৈব সার মিশিয়ে জমি প্রস্তুত করছেন, বেড়ে ওঠা ক্ষেতে কেউবা দিচ্ছেন পানি। কেউ বুনছেন পেঁয়াজ, রসুনসহ নানান শাকসবজির বীজ।

কম খরচে বেশি লাভ মিষ্টিকুমড়ায়
কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, একেকটি গাছে আট থেকে ১০টি কুমড়া পাওয়া যায়। প্রতিটি কুমড়ার ওজন হয় তিন থেকে চার কেজি। শুরুতে ক্ষেতেই ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে কুমড়া বিক্রি হয়। কম খরচে বেশি লাভ করতে বালুচরে মিষ্টিকুমড়ার বিকল্প নেই।

শংকরদহ চরে ৮০ শতক জমিতে পেঁয়াজ ও রসুন চাষ করেছেন আহাদ আলী। তিনি বলেন, ‘চরের পলি পড়া জমিতে পেঁয়াজ-রসুনের ফলন খুব ভালো হয়। নিজেদের সারা বছরের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিক্রিও করা যায়।’

কৃষকরা জানান, চরের জমিতে শুধু শুকনো মৌসুমে আবাদ করার সুযোগ পান তারা। পলি জমে থাকা জমিতে কম খরচ ও স্বল্প শ্রমেই ভালো ফলন হয়। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে কষ্টসহ শেষ দিকে নদীতে পানি না থাকায় সেচ সংকট দেখা দেয়।

গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, বর্ষায় তিস্তার খরস্রোত চরাঞ্চল প্লাবিত করে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। একই সঙ্গে ভাঙনে বিলীন হয় জমি ও বসতভিটা। তবে শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা চরই কৃষকের আশীর্বাদ হয়ে আসে। এখানকার বেশির ভাগ এলাকা তিস্তার তীরবর্তী হওয়ায় মানুষজন চরে আবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। কৃষকদের সার, বীজসহ আধুনিক কৃষির কলাকৌশল এবং সেচের ব্যবস্থাসহ সরঞ্জমাদি সরবরাহ করলে তারা অধিক পরিমাণ ফসল উৎপাদন করতে পারবেন।

সহায়তা পাচ্ছেন কৃষকরা
গঙ্গাচড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ শাহিনুর ইসলাম জানান, চলতি বছর উপজেলায় মিষ্টিকুমড়া চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬০ হেক্টর। ইতোমধ্যে ১০০ হেক্টর জমিতে কুমড়া চাষ হয়েছে। চরাঞ্চলের কুমড়া চাষিদের বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, তিস্তার চরের বিশাল এলাকা চাষের আওতায় আসায় অর্থনীতির দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। চরের উৎপাদিত মিষ্টিকুমড়া দেশের বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। আমরা আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্প্রসারণে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। চরে আবাদ করা ফসলে বেশি সেচের প্রয়োজন হয় না। তার পরও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বারিড পাইপের মাধ্যমে সেচের ব্যবস্থা করেছে। এ সুবিধার বাইরে থাকা জমিতে কৃষকরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেচ দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন

×