পিরোজপুরের নাজিরপুর
বিশেষ বরাদ্দের কাজে নয়ছয়, টাকা আত্মসাৎ
নাজিরপুর (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
পিরোজপুরের নাজিরপুরে উন্নয়নকাজের জন্য বিশেষ বরাদ্দপ্রাপ্ত ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের গোপনীয় সহকারী (সিএ) মো. ইয়াসির আরাফাতের বিরুদ্ধে। অন্য তিন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে তিন ধরনের কাজ দায়সারাভাবে চলার মধ্যেই তিনি ওই টাকা তুলে নিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পগুলোর ফাইলও তিনি গায়েব করে দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নামসর্বস্ব পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কাজগুলোর দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে উপজেলার ডরমিটরি ভবনের সংস্কারকাজটি উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম শফিকের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শফিক এন্টারপ্রাইজকে দেওয়া হয়। এ কাজের বরাদ্দ ১০ লাখ টাকা। ইউএনওর বাসভবনের সামনের রাস্তার জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয় মো. মোজাম খানের মেসার্স খান এন্টারপ্রাইজের নামে। এ কাজের বরাদ্দ ২০ লাখ টাকা। ইউএনও অফিস সংস্কারের ১০ লাখ টাকার কাজটি দেওয়া হয় মেসার্স আল মাহমুদ এন্টারপ্রাইজের নামে। সব ঠিকাদারই ইয়াসির আরাফাতের ঘনিষ্ঠ। কিন্তু ওই ঠিকাদাররা জানান, কাজগুলো তারা করেননি। বিলও তোলেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডরমিটরি ও রাস্তার কাজ গত ১৬ জুন শুরু হয়। আর ইউএনও অফিস সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে। অথচ জুনের শেষদিকেই ৪০ লাখ টাকার বিল তুলে নেন ইয়াসির আরাফাত।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসির আরাফাত তাঁর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের লাইসেন্সের কপি নিজের কাছে রেখে দেন। সেটি ব্যবহার করে বেনামে নানা কাজ দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কিছু সত্যতাও মিলেছে। গত ২২ অক্টোবর উপজেলা পরিষদে অডিটে আসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি দল। এর নেতৃত্বে ছিলেন মন্ত্রণালয়ের অ্যাকাউন্টস অফিসার এ বি সিদ্দিক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অডিট অফিসার মো. তানভীর আহম্মেদ, পান্নু শেখ ও নূরে আলম। নূরে আলম গতকাল সোমবার সমকালকে বলেন, নাজিরপুর সদরে অবস্থিত পাকমঞ্জিল মাদ্রাসায় বরাদ্দ দেখিয়ে কাজ না করে টাকা আত্মসাৎ, বৈরাগী এলাকায় প্রকল্প দেখিয়ে কাজ না করেই বিল নিয়ে যাওয়াসহ বহু অনিয়মের তথ্য রয়েছে ইয়াসির আরাফাতের বিরুদ্ধে। এসব নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন সই করে প্রধান কার্যালয়ে দিয়েছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ভাষ্য, তাদের লাইসেন্স ইয়াসির আরাফাত চেয়ে নিয়েছিলেন। তিনি কী কাজ করেছেন, তা জানা নেই। তারা কোনো চেকও পাননি। বিল তোলা হয়েছে কিনা, জানেন না। শফিক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, তাঁর লাইন্সেসটি ২০২৫ সালের মে মাসের দিকে নিয়েছিলেন ইয়াসির আরাফাত। এরপর আর কিছুই তাঁর জানা নেই।
এ বিষয়ে বর্তমান উপজেলা প্রকৌশলী জিয়ারুল ইসলাম মন্তব্য করতে রাজি হননি। তৎকালীন উপজেলা প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. রাইসুল ইসলামের দাবি, তিনি কিছুই জানেন না।
ইয়াসির আরাফাতের কাছে গতকাল সোমবার এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজেকে মানসিকভাবে অসুস্থ দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে আপনার সঙ্গে এখন কোনো কথা হবে না। আপনি অফিসে আসেন।’ এই বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন।
গত ৯ জুলাই নাজিরপুরে যোগ দেওয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা বলেন, ‘এ কাজগুলো আমার যোগদানের আগে। এ সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই, তাই কিছু বলতে পারব না। খোঁজ নিয়ে পরে জানানো যাবে।’
ইউএনও অফিস সূত্রে জানা গেছে, এসব কাজের নথিপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাওয়া যাচ্ছে না। উপজেলা পরিষদে যখন অডিট টিম এসেছিল, তখনও ফাইল দেখাতে পারেননি ইয়াসির আরাফাত।
তৎকালীন ইউএনও মো. ফজলে রাব্বি মোবাইল ফোনে বলেন, ‘অফিস থেকে ফাইল গায়েব হওয়ার কথা না। আমার মনে হচ্ছে, আপনাকে ফাইল দেবে না বলে ফাইল নেই বলেছে।’ তাঁর ভাষ্য, ‘অফিসের ফাইল অফিসে থাকবে। বেশ কয়েকদিন আগের কথা তো মনে নেই। তবে উপজেলা ইঞ্জিনিয়ারের সই ছাড়া তো আমি কোনো ফাইলে সই করিনি।’ কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল তোলার বিষয়ে তিনি খোঁজ নেবেন বলে জানান।
