২০টি ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিং বন্ধ, দুর্ভোগে হাজারো মানুষ
শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পশ্চিম বড়চর এলাকায় লোহার পাত দিয়ে বন্ধ করা রেলক্রসিং সমকাল
রাসেল চৌধুরী, হবিগঞ্জ
প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৩ | আপডেট: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা-সিলেট রেলপথের হবিগঞ্জ অংশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৪৬টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে বন্ধ করা হচ্ছে ২০টি। মাধবপুর থেকে বাহুবল পর্যন্ত অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এই ক্রসিংগুলো বন্ধ করা হচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তেই।
প্রথম ধাপে এই এলাকার মোট ৪৬টি ক্রসিংয়ের মধ্যে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি ক্রসিং সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে বাকি ক্রসিংগুলোও বন্ধ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এই রুটে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে এবং ট্রেনের গতিবেগ স্বাভাবিক রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো আগাম ঘোষণা বা বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই হঠাৎ ক্রসিংগুলো বন্ধ করায় বিপাকে পড়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন দেখা গেছে, ক্রসিংগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় দুই পাশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এতে কৃষিপণ্য পরিবহন, স্কুল-কলেজে যাতায়াত এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে আসা হাজার হাজার মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়রা দ্রুত বিকল্প পথ বা ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশেষ করে ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্সের মতো জরুরি সেবা পৌঁছানো নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, তারা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এসব ক্রসিং ব্যবহার করে যাতায়াত এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া করছেন। এখন চলাচলের পথগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ায় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে।
গ্রামবাসীর দাবি, বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে এভাবে পথ বন্ধ করে দেওয়া অমানবিক। এতে রোগী পরিবহন ও অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রেলপথে দুর্ঘটনা রোধ ও ট্রেনের গতিবেগ বাড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ অঞ্চলের ৪৬টির মধ্যে প্রথম ধাপে ২০টির অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং বন্ধ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকিগুলো বন্ধের আওতায় আনা হবে। জনস্বার্থ বিবেচনায় স্থানীয়রা বিকল্প রাস্তা বা ওভারপাস নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয়রা চাইলে গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংগুলোতে নিজস্ব অর্থায়নে গেটম্যানসহ গেট চালুর অনুমোদন নিতে পারবেন। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, মূলত দুর্ঘটনা কমাতেই রেলক্রসিংগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পশ্চিম বড়চর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকায় প্রবেশের একমাত্র ক্রসিংটি হঠাৎ করেই বন্ধ করে দিচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তারা পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই লোহার পাত ও খুঁটি বসিয়ে রাস্তাটি বন্ধ করে দিচ্ছে। আর এর প্রতিবাদ জানাচ্ছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে তারা এই ক্রসিংটি ব্যবহার করে আসছেন। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস কিংবা পণ্যবাহী পরিবহনও এই ক্রসিং ব্যবহার করে গ্রামে প্রবেশ করে। হঠাৎ ক্রসিংটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চলাচলে চরম বিঘ্ন ঘটছে।
শুধু পশ্চিম বড়চর নয়, মাধবপুর থেকে বাহুবলের শেষ সীমা পর্যন্ত প্রায় ৪৬টি ক্রসিং বন্ধ করে দিচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। যদিও কিছু কিছু লোকজন মনে করছেন পূর্ব ঘোষণা দিয়ে ক্রসিংগুলো বন্ধ করা হলে মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমত। স্থানীয়রা বিকল্প পথ ব্যবহার করতেন।
বড়চর গ্রামের বাসিন্দা আলী মিয়া জানান, ৫০ বছরেরও অধিক সময় ধরে এই ক্রসিং ব্যবহার করে গ্রামে আসা-যাওয়া করছিলেন। এখন এটি বন্ধ করা হচ্ছে। এই ক্রসিংটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন। এলাকার জনবহুল এই ক্রসিংটি বন্ধ না করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যদি গেটম্যান দিত, তা হলে দুর্ভোগে পড়তে হতো না।
মিরপুর এলাকার বাসিন্দা দিদার এলাহী জানান, রেলওয়ের হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তে হতবাক গ্রামবাসী। এমনও ক্রসিং রয়েছে, যেখানে রেললাইনের ওপর দিয়ে এলজিইডির রাস্তা পর্যন্তু চলে গেছে। এখন সেসব রাস্তা বন্ধ করা হচ্ছে, একই সঙ্গে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ বাড়ছে।
রাজু মিয়া নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ক্রসিং বন্ধ করা হচ্ছে ভালো কথা। কিন্তু অধিক জনবহুল ক্রসিংগুলোতে যদি গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হতো তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ হতো না। আসিফ মিয়া বলেন, তাঁর বাড়ির সামনে ক্রসিংটি বন্ধ করা হয়েছে। এখন বিকল্প পথ ব্যবহার করে বাড়ি থেকে বের হতে হচ্ছে। এতে সময় বেশি যাচ্ছে পরিবহন খরচও বেড়েছে। মুহিন শিপন নামে এক কলেজ ছাত্র বলেন, শায়েস্তাগঞ্জ ও বাহুবলে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে রেললাইনের পাশে। এখন পর্যায়ক্রমে সব ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হলে ভোগান্তিতে পড়তে হবে শিক্ষার্থীদের।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়ার্কার সুপারভাইজার নজির আহমেদ বলেন, দুর্ঘটনা এড়াতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ ক্রসিংগুলো বন্ধ করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংগুলোতে স্থানীয়রা নিজস্ব অর্থায়নে গেটম্যানসহ গেট পরিচালনার ইচ্ছা থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ আছে।
- বিষয় :
- রেলক্রসিং
- রেল যোগাযোগ
- ভোগান্তি
