প্রকৌশলীশূন্য জেলা পরিষদ আটকা ৫৭১ উন্নয়ন প্রকল্প
আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর
প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৩১ | আপডেট: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রকৌশলী না থাকায় এস্টিমেট বা ব্যয় প্রাক্কলন প্রস্তুত করা যাচ্ছে না। ফলে শুরু করা সম্ভব হয়নি জামালপুর জেলা পরিষদের পাঁচ শতাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলেও ইতোমধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছে। ফলে আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ।
জেলা পরিষদের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জামালপুর জেলা পরিষদ দরপত্রের মাধ্যমে ১৪০টি এবং পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) মারফত ৪৩১টি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে সদরসহ সাত উপজেলার স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম, শ্মশানঘাট, ঈদগাহ মাঠ, এতিমখানা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি প্রকল্পে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বরাদ্দের পরিমাণ ১৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সম্প্রতি বদলি হওয়া জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের তৎকালীন প্রশাসক হাসিনা বেগমের সঙ্গে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন বাবুর মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। সময়মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কার্যত থমকে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষুব্ধ বিভিন্ন প্রকল্প কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
এ অবস্থায় গত ৯ নভেম্বর ‘প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহীর মতানৈক্য, ৭৮২ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত’ শিরোনামে সমকালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনই বদলি হন জেলা প্রশাসক হাসিনা বেগম। তাঁর স্থলে যোগদান করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী।
নতুন জেলা প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণের পর স্থগিত প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আরেকটি জটিলতা দেখা দেয়। জেলা পরিষদের প্রকৌশলী শূন্যতা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান গত ৪ ডিসেম্বর বদলি হওয়ায় জেলা পরিষদ কার্যত প্রকৌশলীশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে প্রকল্পগুলোর ‘এস্টিমেট’ প্রস্তুত করা সম্ভব না হওয়ায় কাজ শুরুর প্রক্রিয়া আবারও থমকে যায়।
একাধিক প্রকল্প কমিটির সদস্য জানান, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জরুরি সংস্কার কাজ এসব প্রকল্পের আওতায় হওয়ার কথা ছিল। কাজ শুরু না হওয়ায় শিক্ষার্থী, মুসল্লি ও স্থানীয় জনগণ ভোগান্তিতে রয়েছেন।
সদর উপজেলার দমদমা এলাকার কারি নওয়াব আলী কেরাতুল কোরআন মাদ্রাসার সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, মাদ্রাসা উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদ থেকে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়। যথাসময়ে প্রকল্প কমিটি ও চুক্তিপত্রসহ সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর দোকান থেকে বাকিতে নির্মাণসামগ্রী কিনে প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু পাঁচ মাস ধরে জেলা পরিষদে ঘুরেও বরাদ্দের টাকা পাচ্ছেন না।
জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন বাবু জানান, জেলা পরিষদের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে সার্বক্ষণিক দুজন উপসহকারী প্রকৌশলী, একজন সহকারী প্রকৌশলী ও দুজন সার্ভেয়ার থাকার কথা থাকলেও নেই কোনো প্রকৌশলী। দীর্ঘদিন ধরে নেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা, প্রধান সহকারী ও হিসাব রক্ষক। ফলে অফিসে অনেক সময় তাঁকে কেরানির কাজও করতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, গত ৪ ডিসেম্বর বদলি হন সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান। এর পর থেকে প্রকৌশলীশূন্য জেলা পরিষদ। এলজিইডি থেকে ধার করা আল-আমিন নামে সার্ভেয়ার থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতির একাধিক মামলা থাকায় তিনিও ঠিকমতো অফিসে আসেন না। তিনি বলেন, জেলা পরিষদের প্রয়োজনে এলজিইডি থেকে প্রকৌশলী দেওয়ার বিধান রয়েছে। জামালপুর এলজিইডিকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এরপরও কোনো প্রকৌশলী দেওয়া হচ্ছে না। যে কারণে প্রকল্পের এস্টিমেটও করা যাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী বলেন, জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু করতে প্রয়োজনীয় প্রকৌশলী সংকটের বিষয়টি ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগকে জানানো হয়েছে। প্রকৌশলী পদায়ন করা হলে দ্রুত ‘এস্টিমেট’ প্রস্তুত করে প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু করা হবে।
- বিষয় :
- উন্নয়ন প্রকল্প
- জামালপুর
- জেলা প্রশাসক
