ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বরিশালে এনডিএফ ও জাপার ৩৪ প্রার্থী

প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, ভোটারের কাছে পরিচিতি পাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ 

প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, ভোটারের কাছে পরিচিতি পাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ 
×

বরিশালের ১৭টি আসনে এনডিএফ ও জি এম কাদেরের জাপা পৃথকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে

সুমন চৌধুরী, বরিশাল 

প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:২৮ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:৩২

বরিশাল বিভাগে সংসদীয় আসন ২১টি। জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) এবং জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা) পৃথকভাবে ১৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তাদের মধ্যে ৩৪ প্রার্থীর অন্তত ২০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসা দূরের কথা, ভোটারদের কাছে পরিচিত হওয়া হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বেশির ভাগ আসনে এনডিএফ জোটভুক্ত ১৮টি দলের একটিরও সাংগঠনিক অস্তিত্ব নেই।

প্রার্থী তালিকায় নাম নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে দুজন প্রার্থী সমকালকে জানান, এনডিএফের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে, জাপায় স্থানীয়ভাবে পরিচিত কিংবা প্রভাবশালী অনেকে প্রার্থী হননি। বিকল্প প্রার্থীদের অনেকে কেন্দ্রে বড় পদধারী হলেও স্থানীয়ভাবে পরিচিত মুখ নন। 

আওয়ামী লীগ আমলের চারটি সংসদের প্রতিটিতে বরিশাল বিভাগে জাপার এমপি ছিলেন দুজন এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) একজন। তবে নিজ দলের সাংগঠনিক দুর্বলতায় তাদের মহাজোটের মনোনয়নে জিততে হয়। 

এবার ঘোষিত প্রার্থীদের মধ্যে এনডিএফের হেভিওয়েট প্রার্থী আছেন মাত্র তিনজন। তারা হলেন– পিরোজপুর-২ (স্বরূপকাঠি, ভাণ্ডারিয়া ও কাউখালী) আসনে এনডিএফ জোটের প্রধান উপদেষ্টা জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, পটুয়াখালী-১ (সদর, মির্জাগঞ্জ ও দুমকী) আসনে জোটের মুখপাত্র জাতীয় পার্টির একাংশের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) তাঁর স্ত্রী নাসরিন জাহান রত্না আমিন। অন্য প্রার্থীদের মধ্যে অনেকের নাম ভোটাররা কখনোই শোনেননি। অন্যদিকে, জি এম কাদেরের জাপায় একমাত্র সাবেক এমপি হলেন বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে গোলাম কিবরিয়া টিপু। 

১৮টি রাজনৈতিক দলের জোট এনডিএফের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয় পার্টি (আনিসুল-রুহুল আমিন) ও মঞ্জুর জেপি। জাতীয় রাজনীতিবিদ আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পিরোজপুর-২ আসনে লড়বেন। তিনি এ আসনে সাতবারের এমপি। এর মধ্যে পাঁচবার জিতেছেন ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী জাতীয় পার্টির সংকটকালীন সময়ে। 

স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তি মঞ্জুই এখানে বড় ফ্যাক্টর। যে প্রতীকেই প্রার্থী হন, তিনিই হন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। হেভিওয়েট এ নেতার বিরুদ্ধে জাপার প্রার্থী হবেন জি এম কাদেরের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। 

জাতীয় রাজনীতিতে হেভিওয়েট নেতা রুহুল আমিন হাওলাদারের ভোটের আমলনামা মঞ্জুর মতো গৌরবোজ্জ্বল নয়। এরশাদ শাসনামলে তিনি দাপুটে মন্ত্রী ছিলেন। তবে ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১-এর নির্বাচনে বরিশাল-৬ আসনে জাপার একক প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়ে তৃতীয় স্থানে ছিলেন হাওলাদার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে এমপি হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত মহাজোটের হয়ে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি পটুয়াখালী-১ আসনে ফের মহাজোটের এমপি হন। 

আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি পটুয়াখালী-১ আসনে এনডিএফের প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে জাপা প্রার্থী করেছে জেলা কমিটির সদস্য আ. মান্নান হাওলারদাকে। এ প্রসঙ্গে জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক জানান, ২০২৪-এর নির্বাচনে মান্নান পটুয়াখালী-৪ আসনে প্রার্থী ছিলেন। এবার কেন এ আসনে আনা হলো, তা আমরা জানি না। 

হাওলাদারের স্ত্রী রত্না আমিন ২০০৪ সালে বাকেরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়ে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেন। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের সংরক্ষিত আসনের এমপি ছিলেন। ২০১৪ সালে হাওলাদার পটুয়াখালী-১ আসনে নির্বাচন করলে স্বামীর আসনে মহাজোটের এমপি হন রত্না আমিন। একই আসনে ২০১৮ সালেও এমপি হন। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্থানীয় আওয়ামী লীগের চাপের মুখে মহাজোটের সমর্থন না পেয়ে প্রার্থী হননি তিনি। 

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাঁকে বরিশাল-৬ আসনে এনডিএফ মনোনীত করেছে। এ আসনে বিকল্প আরেক প্রার্থী তৃণমূল বিএনপির এটিএম জহিরুল হক তুহিনকে রাখা হয়েছে। এটা ষড়যন্ত্র দাবি করে তুহিন সমকালকে বলেন, এনডিএফ কিংবা তৃণমূল বিএনপির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। গণঅধিকার পরিষদ আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। সেই দলের হয়ে নির্বাচন করব। জানা গেছে, তুহিন ২০২৪ সালে তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। এ আসনে জাপা প্রার্থী দেয়নি। 

২০০৯, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসনে মহাজোটের এমপি ছিলেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু। বর্তমানে তিনি কারাবন্দি। জাপা মনোনয়ন ঘোষণার আগে তাঁর সমর্থকরা নির্বাচনী তৎপরতা শুরু করেছেন। এ আসনে এনডিএফ প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির ফখরুল ইসলাম শাহজাদা মুন্সী। তিনি মুলাদীর সফিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়্যারম্যান। 

এমএ কুদ্দুস খান নামের একজনকে ঝালকাঠি-২ (সদর-নলছিটি) আসনে এনডিএফ ও জাপা দুই দলেই প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে। আসনটিতে জাপা ঘোষিত আরেক প্রার্থী মো. নাসির উদ্দিন ইমরান। এমএ কুদ্দুস সমকালকে বলেন, আমি জি এম কাদেরের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। তাঁর দল থেকেই প্রার্থী হবো। এনডিএফ তালিকায় আমার নাম থাকার কারণ জানি না। 

২০২৪ সালের নির্বাচনে পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে মহাজোটের প্রার্থী জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাশরেকুল ইসলাম রবি মাত্র ৬৬০ ভোট পান। এবারও তাঁকে মনোনীত করেছে জাপা। অন্যদিকে, এনডিএফ প্রার্থী হয়েছেন সেকান্দার আলী মুকুল বাদশা। সাবেক এই ব্যাংকার জাপার রাজনীতিতে সক্রিয় নন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। 

পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়ে জাপা ছেড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন কুয়াকাটা পৌর মেয়র (অপসারিত) আনোয়ার হোসেন হাওলাদার। তিনি পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনে এনডিএফ মনোনীত প্রার্থী। তবে আনোয়ার জানান, এই আনোয়ার তিনি নন। প্রার্থী আনোয়ার কে তিনি জানেন না। তবে জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক নিশ্চিত করেন, সাবেক মেয়র আনোয়ারই প্রার্থী। কৌশলগত কারণে তিনি অস্বীকার করছেন। 

বিভাগে মর্যাদার আসন হিসেবে পরিচিত বরিশাল-৫ (মহানগর-সদর) আসনে বিগত নির্বাচনে জাপার প্রার্থী ছিলেন নগরের পরিচিত মুখ দলীয় চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইকবাল হোসেন তাপস। এবার তাঁকে বরিশাল-৩ আসনের প্রার্থী টিপুর বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে। তাপসের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। বরিশাল-৫ আসনে জাপায় মনোনীত হয়েছেন আখতার হোসেন সপ্রু। যিনি ভোটের মাঠে পরিচিত মুখ নন। 

এ প্রসঙ্গে জাপার কেন্দ্রীয় সদস্য একেএম মোস্তফা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কেউ প্রার্থী হতে চান না। তাই ২০১৬ সালে জাপায় যোগ দেওয়া সপ্রুকে প্রার্থী করা হয়েছে। স্থানীয় জাপার বড় অংশ তাঁর সঙ্গে নেই। প্রার্থী সংকটে প্রায় সব আসনেই দুর্বল প্রার্থী দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের অনেকেই মনোনয়নপত্র দাখিল করবেন না। 

গোটা বিভাগেই জাপা শক্তিশালী প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হয়েছে স্বীকার করে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ মহসিন উল ইসলাম বলেন, আমরা নির্বাচন করতে পারব কিনা, এ নিয়ে সন্দিহান ছিলাম। তাই আমরা ভালো প্রার্থী সেভাবে খুঁজিনি। 

আরও পড়ুন

×