সুনামগঞ্জ-১
কামরুজ্জামানকে বিকল্প প্রার্থী ঘোষণা, বিব্রত স্থানীয় বিএনপি
কামরুজ্জামান কামরুল
ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৯:২২
সুনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা-মধ্যনগর-তাহিরপুর-জামালগঞ্জ) আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান কামরুলকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এর আগে গত ৩ নভেম্বর এ আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক আনিসুল হককে মনোনয়ন দেওয়া হয়। গত ২৪ ডিসেম্বর তাকে চূড়ান্ত মনোনয়নের চিঠিও দেয় দলটি। কিন্তু গত রোববার রাত নয়টার দিকে কামরুজ্জামান কামরুল দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন জানিয়ে তার ফেসবুকে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ২৭ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পোস্ট করেন। চিঠিটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ফলে কে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন তা নিয়ে এ আসনের বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে বিভ্রান্তি ও বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
গত রোববার বিকেলে কামরুজ্জামান বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় বিষয়টি স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এলাকাবাসী জানায়, বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান কামরুলকে নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। তিনি তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট সরকারি কলেজে পরিচালিত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) স্টাডি সেন্টারের অধীনে বিএ-২২ ব্যাচের ৩য় ও ৪র্থ সেমিস্টারের পরীক্ষার্থী ছিলেন। যার শিক্ষার্থী আইডি নম্বর-২২০২৩৬৩৪০৫০। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিএ-২২ ব্যাচের ৩য় ও ৪র্থ সেমিস্টারের পরীক্ষা গ্রহণের জন্য গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে রুটিন প্রকাশ করে। গত ২০ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ইতিহাস-২ এবং ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞান-২ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠিত ওই দুটি পরীক্ষার দিন কামরুজ্জামান লন্ডনে অবস্থান করলেও কামরুজ্জামানের হয়ে ২০ ও ২৬ সেপ্টেম্বরের দুটি পরীক্ষাতেই অংশগ্রহণ করেন কামরুজ্জামানের ভাতিজি জামাই মিজানুর রহমান মিজান। কৌশলে পরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানের অফিস কক্ষে গোপনে দুটি বিষয়ের পরীক্ষাতেও অংশগ্রহণ করেন মিজান। কামরুজ্জামান ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে সিলেট ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে দেশে আসেন। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচারিত হয়েছে। এ ব্যাপারে ওই কেন্দ্রের একজন পরীক্ষার্থী শিক্ষা উপদেষ্টা, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, সিলেট বিভাগীয় কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে লিখিত অভিযোগ করায় বিষয়টি সামনে আসে।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেটের আঞ্চলিক পরিচালক মো. মোকছেদার রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, এ সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে এবং তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।
পরীক্ষার্থীর অভিযোগ অনুযায়ী, তাহিরপুর উপজেলার মধ্য তাহিরপুর গ্রামের মফিজ উদ্দিনের ছেলে মিজান কামরুজ্জামানের পক্ষে দুটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন। আর এমন জালিয়াতির কাজে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছেন বাদাঘাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট কলেজের অধ্যক্ষ জুনাব আলী। অভিযোগ রয়েছে অন্য পরীক্ষার্থীদের দৃষ্টি এড়াতে জুনাব আলী তার অফিস কক্ষে মিজানকে পরীক্ষার সুযোগ দিতেন। পরীক্ষা শুরু হওয়ার অনেক আগে মিজানকে অধ্যক্ষ তার কক্ষে নিতেন এবং পরীক্ষা শেষ হওয়ার অনেক পরে তাকে কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সুযোগ করে দিতেন। একই কায়দায় কামরুজ্জামানের ১ম ও ২য় সেমিস্টারের পরীক্ষাও মিজান দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিজেকে কামরুজ্জামানের ভাতিজির জামাই পরিচয় দিয়ে মিজানুর রহমান মিজান বলেন, ‘বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও একেবারেই ভিত্তিহীন। এর কিছুই আমি জানি না। চাইলে কলেজে খবর নিতে পারেন।’
বাউবির বাদাঘাট সরকারি ডিগ্রি কলেজ স্টাডি সেন্টারের কো-অর্ডিনেটর ও সংশ্লিষ্ট কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের প্রভাষক মিসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমি কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও হল সুপারের দায়িত্ব পালন করেন অন্যজন। এ ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত করে যাওয়ার পর মিজান আর পরীক্ষা দিতে আসেনি।’
ওই পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা হল সুপার ও সংশ্লিষ্ট কলেজের ইতিহাস বিষয়ের প্রভাষক টিটু বিশ্বাস বলেন, ‘ফোনে কথা বলা কি ঠিক হবে? বিষয়টি তদন্ত হচ্ছে। এর বেশি কিছু জানি না।’
বাদাঘাট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জুনাব আলী বলেন, ‘অফিস রুমে বসিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানোর প্রশ্নই আসে না। এরকম অনিয়ম করলে অধ্যক্ষ হিসেবে থাকতে পারতাম না। মাস দুয়েক আগের ঘটনা হলেও এমপি প্রার্থীদের প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক কারণে বিষয়টি বারবার সামনে আসছে। যে বা যারা অভিযোগ দিয়েছে তারা ভেবেছে আমি এই পরীক্ষা কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর। আমি আওয়ামী অনুসারী ছিলাম। কিন্তু কলেজ সরকারি হওয়াতে রাজনীতি করা যায় না। আমার বিরুদ্ধে এটি একটি ষড়যন্ত্র। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে তদন্ত করেছে। তদন্তের পর মিজান আর পরীক্ষা দিতে পারেনি বলেও জানান অধ্যক্ষ।’
এ ব্যাপারে কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সামনে রেখে শতভাগ ভূয়া একটি বিষয় নিয়ে আমার নামে এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
মনোয়নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়ের দপ্তর থেকে রোববার রাত ৮টায় আমাকে চিঠি আনার জন্য ফোন দেওয়া হয়। আমি নির্বাচনী এলাকায় থাকায় রাজধানীতে আমার একজন আত্মীয় গিয়ে চিঠি রিসিভ করেন।’
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আনিসুল হক বলেন, বিএনপির চূড়ান্ত মনোনীত প্রার্থী হিসেবে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। কামরুজ্জামান কামরুলকে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত) জিকে গউছ গণমাধ্যমকে জানান, দলের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা বিকল্প প্রার্থী রেখেছেন। ফলে তাদের মনোনীত প্রার্থীদেরকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের সময় দলের নির্দেশনা দেয়ার পর যাকে বলা হবে তিনি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন বলেও জানান তিনি।
- বিষয় :
- সংসদ নির্বাচন
- সিলেট
- সুনামগঞ্জ-১
- বিএনপি
