ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা সীমিত তবুও নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ

দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা সীমিত তবুও নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণ
×

ফায়ার অ্যান্ড ডিফেন্স সার্ভিসের সম্মতি উপেক্ষা করে এবং পৌর কর্তৃপক্ষের নীতিমালা না মেনে বিয়ানীবাজার পৌর শহরে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন সমকাল

 আহমেদ ফয়সাল, বিয়ানীবাজার (সিলেট)

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

যে কোনো দুর্ঘটনা বা দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষতি কমাতে সামনের সারিতে কাজ করতে হয় ফায়ার অ্যান্ড ডিফেন্স সার্ভিসের কর্মীদের। প্রতিটি ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের আওতায় থাকে নির্ধারিত এলাকা। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় একাধিক এলাকার স্টেশন সম্মিলিতভাবেও কাজ করে।

সিলেটের বিয়ানীবাজারে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য সংকটে সেবা পেতে ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে চাহিদা অনুসারে পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা না থাকা এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন জটিলতায় ইচ্ছা থাকলেও প্রয়োজনীয় সেবা দিতে না পারার আক্ষেপের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।  

যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলা এবং বহুতল ভবনের উদ্ধার অভিযানে বিয়ানীবাজার ফায়ার অ্যান্ড ডিফেন্স সার্ভিস স্টেশনের সক্ষমতা উচ্চতার দিক থেকে মাত্র ৩০ ফুট। অথচ প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরশহর, শহরতলীসহ পৌর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৫০ ফুটের বেশি উচ্চতার বহুতল ভবন রয়েছে অনেকগুলো। এর মাঝে শুধু পৌরসভায় রয়েছে ১৩৫টি। অভিযোগ রয়েছে, দেশের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত এসব এলাকায় ফায়ার ও ডিফিন্স সার্ভিসের সক্ষমতা বিবেচনায় না নিয়ে এসব বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে পৌরসভা।
সূত্র জানায়, পৌর এলাকায় ভবন নির্মাণের অনুমোদন প্রদানের জন্য কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক হলেও ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের আগ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো কমিটি এখানে ছিল না।
সে সময়ে পৌর প্রশাসক, মেয়র, সচিব ও প্রকৌশলীরা ভবন নির্মাণে যে অনুমতিপত্র দিয়েছেন, সেখানে পৌরসভার ভবন নির্মাণ নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। দায়িত্বশীলরা নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে দুই যুগের বেশি সময় থেকে ভবন নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছেন।

বিয়ানীবাজার ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সার্ভিস স্থাপিত হয় ২০১৩ সালে। সি গ্রেডের এ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উন্নয়ন না হওয়ায় ১০ জনের লোকবলে পাঁচ লাখ মানুষের সেবা দিচ্ছেন দমকল বাহিনীর সদস্যরা। ৫০ ফুট বা এর বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণের জন্য ভবন মালিককে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নিতে হয়। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির জোগান রাখা, লিফট সংযোগ করা এবং জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক থাকলেও বহুতল ভবনের অনেকগুলোতেই এসব নির্দেশনা মানা হয়নি। পৌরশহরের কয়েকটি ভবনে লিফট থাকলেও পানির জোগান বা জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
বিয়ানীবাজার ফায়ার অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা অফিসার সুকুমার সিংহ বলেন, আঠারোশত লিটার পানি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটিমাত্র অগ্নিনির্বাপণ যান রয়েছে তাদের স্টেশনে। পর্যাপ্ত জলাশয় না থাকায় প্রতি সপ্তাহে পাম্প ওয়েস্ট টেস্ট করা যাচ্ছে না। অগ্নিকাণ্ডের সময় মেলে না পানির জরুরি জোগানও। ৩০ ফুটের বেশি উচ্চতার কোনো ভবনে দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নেই তাদের। ৬০ ফুট উচ্চতার ভবন দেখিয়ে তিনি বলেন, এসব ভবন নির্মাণে নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদনও নেওয়া হয়নি।

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, বিয়ানীবাজার পৌরশহর, শহরতলী ও পৌরসভা এলাকায় দুইতলাবিশিষ্ট ভবন রয়েছে ২২৪টি, তিনতলা ভবন রয়েছে ১৪৫টি, চারতলা ৫২টি, পাঁচতলা ১১৮টি, ছয়তলা ১০টি এবং সাততলা ভবন রয়েছে সাতটি। বহুতল ভবনের অধিকাংশই পৌরশহর ও শহরতলী এলাকায়। আবাসিক এলাকায় দুটি সাততলা ভবনসহ বেশ কিছু বহুতল ভবন রয়েছে।
বিয়ানীবাজার পৌরসভার সাবেক প্রশাসক ও সদ্য বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম মুস্তফা মুন্নার সঙ্গে আলাপকালে তিনি সমকালকে বলেন, ২০০১ সালে পৌরসভা স্থাপিত হলেও ২০২৫ সালের আগে এখানে ভবন নির্মাণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়নি। যার কারণে বহুতল ভবন নির্মাণে যেসব নিয়ম প্রতিপালন করার কথা, ভবন মালিকরা তা করেননি। এখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করার সময় ভবনের বাইরে জায়গা খালি রাখা হয়নি। দুর্যোগকালে জরুরি বহির্গমন পথ নেই। ভবনে আগুন লাগলে পানির জোগান নেই এবং বেশির ভাগ ভবনে লিফট নেই।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা জানান, কমিটির দায়িত্বশীলদের ত্রুটিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়মের আওতায় নিয়ে আসতে ভবন মালিকদের করণীয় নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ঘটিত পৌরসভার ভবন নির্মাণ কমিটি গঠনের পর ১১টি ভবন ও তিনটি মার্কেট নির্মাণের জন্য পৌরসভার অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যেসব নিয়ম মানা আবশ্যক, নকশায় সেগুলো মানা হয়নি। গত মে মাসে কমিটির সভায় ১১টি ভবন নির্মাণের জন্য নকশা জমা দিলেও সেগুলো অনুমোদন পায়নি।
গোলাম মুস্তফা মুন্না বলেন, পৌরসভার ভবন নির্মাণ কমিটি নকশা অনুমোদন করে। যেসব ভবনের নকশায় ত্রুটি ছিল, তার দায়িত্বকালে সেগুলোর মধ্যে যারা সংশোধন করেছেন তাদের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেই কমিটি তিনটি মার্কেটসহ ছয়টি ভবনের অনুমতি দিয়েছিল।

আরও পড়ুন

×