শব্দদূষণ
চট্টগ্রামে নীরব এলাকাতেই শব্দের মাত্রা ৭৩% বেশি
হাসপাতাল-স্কুল, আবাসিক এলাকায়ও হর্নের বাড়াবাড়ি
আব্দুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪০
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান ফটক। যানজটে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির একটু পরপর বিকট হর্ন। গাড়ির জন্য অপেক্ষায় থাকা গৃহিণী রোকসানা আক্তার এতে বেশ বিরক্ত। হাসপাতালে এসেছিলেন জ্বর ও মাথাব্যথার চিকিৎসা নিতে। জানতে চাইলে বললেন, ‘এমনিতে মাথাব্যথা। এর মধ্যে গাড়ির হর্নের কারণে মনে হচ্ছে, মাথার ভেতর সব রক্তনালি ছিঁড়ে যাবে। অকারণে হর্ন দিচ্ছেন চালকরা।’
শুধু এই এলাকাতেই নয়, চট্টগ্রামের সব রাস্তাঘাটে চলছে এমন শব্দদূষণ। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) পরিবেশগত এক জরিপে দেখা গেছে, বন্দর নগরীর হাসপাতাল, স্কুলসহ স্পর্শকাতর নীরব এলাকাতেই শব্দের নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ৭৩ শতাংশ বেশি। একে উদ্বেগজনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ কারণে নগরবাসীর শ্রবণশক্তি, ঘুম, রক্তচাপ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব পড়ছে। শব্দদূষণ কমাতে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। পুরো বছরে মাত্র একটি জরিমানা করার উদাহরণ রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের।
চট্টগ্রামের জন্য মহাপরিকল্পনা তৈরি করছে সিডিএ। এর অংশ হিসেবে পরিবেশগত জরিপটি করা হয়েছে। নগরীর নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প শ্রেণির ২০টি এলাকায় শব্দের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, নগরের অক্সিজেন মোড়ে সর্বোচ্চ দিনে সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা ৮৯.৪ ও রাতে ৮৩.৭ ডেসিবল। সর্বনিম্ন শব্দদূষণ জাকির হোসেন সড়কের ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল এলাকায়। এখানে দিনে ৫৭ দশমিক ১ ডেসিবল ও রাতে ৫৩ দশমিক ২ ডেসিবল।
নীরব এলাকাতেই শব্দের মাত্রা ৭৩ শতাংশ বেশি
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা। এখানে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা নির্ধারণ করা আছে।
নগরীর যেসব নীরব এলাকায় শব্দের মান যাচাই করা হয়েছে সেখানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শব্দের মাত্রা ছিল নগরের বায়েজিদ বোস্তামী মাজার এলাকায়। এখানে দিনে শব্দের মাত্রা ৭৫ দশমিক ৪ ডেসিবল ও রাতে ৬৯ দশমিক ৩ ডেসিবল। নীরব এলাকার নির্ধারিত মানমাত্রা অনুযায়ী যা রাতে ৭৩ শতাংশ ও দিনে ৫১ শতাংশ বেশি। সর্বনিম্ন শব্দদূষণের মাত্রা রেকর্ড করা হয় নগরীর জাকির হোসেন সড়কের ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল লিমিটেড এলাকায়। এখানে দিনে সর্বোচ্চ ৫৭ দশমিক ১ ও রাতে ৫৩ দশমিক ২ ডেসিবল, যা দিনে নির্ধারিত মাত্রার ১৪ শতাংশ ও রাতে ৩৩ শতাংশ বেশি।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটি এলাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া গেছে দিনে ৭২ দশমিক ৮ ও রাতে ৬৫ দশমিক ২ ডেসিবল। এরপরই নগরের কাজির দেউড়ি এলাকায় দিনে ৭১ দশমিক ৩ ও রাতে ৬৪ দশমিক ৭ ডেসিবল। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকায় দিনে ৬৯ দশমিক ৬ ও রাতে ৬১ দশমিক ৪ ডেসিবল।
আবাসিক ও মিশ্র এলাকায়ও স্বস্তি নেই
জরিপে নগরীর দুটি আবাসিক এলাকায় শব্দের মানমাত্রা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে নগরীর অক্সিজেন শীতলঝর্ণা আবাসিক এলাকায় রাতে সর্বোচ্চ ৬০ দশমিক ৯ ও দিনে ৫৫ দশমিক ৫ ডেসিবল। আবাসিক এলাকার শব্দের মাত্রা রাতে ৪৫ ও দিনে ৫৫ ডেসিবল। সে হিসাবে রাতে শব্দদূষণ ২৩ শতাংশ ও দিনে ১১ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া খুলশী আবাসিক এলাকায় রাতে শব্দের মানমাত্রা ৫৪ দশমিক ২ ও দিনে ৬০ দশমিক ১ ডেসিবল।
একই সঙ্গে আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় এমন মিশ্র পাঁচটি এলাকায় শব্দের মানমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং পয়েন্ট, অলংকার মোড়, চট্টগ্রাম বন্দর সংযোগ সড়ক, অক্সিজেন মোড় ও পটিয়া শান্তির হাট। সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণ অক্সিজেন মোড় এলাকায়। যেখানে দিনে সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা ৮৯ দশমিক ৪ ও রাতে ৮৩ দশমিক ৭ ডেসিবল, যা রাতে নির্ধারিত মানমাত্রার ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশং ও দিনে ৪৯ শতাংশ বেশি।
এ ছাড়া নগরের অংলকার মোড়ে দিনে শব্দের মাত্রা ৮৮ দশমিক ৬ ও রাতে ৮৩ দশমিক ৮ ডেসিবল, নগরের পটিয়া শান্তির হাট এলাকায় দিনে ৭৫ দশমিক ৭ ও রাতে ৬৫ দশমিক ৭ ডেসিবল, সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড এলাকায় দিনে ৭৪ দশমিক ৩ ও রাতে ৫৭ দশমিক ২ ডেসিবল এবং চট্টগ্রাম বন্দর সংযোগ সড়কে দিনে ৬২ দশমিক ৪ ও রাতে ৫৩ দশমিক ৬ ডেসিবল।
রিয়াজউদ্দিন বাজারে সর্বোচ্চ শব্দ
নগরীর তিনটি বাণিজ্যিক এলাকা শব্দের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে রিয়াজউদ্দিন বাজারে দিনে সর্বোচ্চ ৮২ দশমিক ৩ ও রাতে ৭১ দশমিক ৪ ডেসিবল, যা নির্ধারিত শব্দমাত্রার মানের রাতে ১৯ শতাংশ ও দিনে ১৮ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭৯ দশমিক ৪ ও ৭৩ দশমিক ৩ এবং কালুরঘাট এলাকায় ৮১ দশমিক ৩ ও ৭০ দশমিক ৪ ডেসিবল। শিল্পাঞ্চলের মধ্যে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় মাত্রা ৭৮ দশমিক ২ ও রাতে ৭৬ দশমিক ৫ ডেসিবল।
যানজট, নির্মাণকাজ ও শিল্প– তিন প্রধান উৎস
যানবাহন, নির্মাণকাজ ও শিল্প কার্যক্রমের সম্মিলিত শব্দ নগরীর দূষণের অন্যতম কারণ। ভারী যানবাহন, বিশেষত ট্রাক, বাস, পুরোনো মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল এবং অদক্ষ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও আইন অমান্যের কারণে সড়কে ক্রমেই বাড়ছে যানজটজনিত শব্দ। পাশাপাশি অবকাঠামো নির্মাণে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে উৎপন্ন উচ্চ শব্দ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় বিধিবিধান যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। বন্দর এলাকা ও শিল্পকারখানায় যন্ত্রপাতি, জেনারেটরসহ নানা কর্মযজ্ঞ থেকেও প্রতিনিয়ত তীব্র শিল্পশব্দ পরিবেশকে দূষিত করছে।
উচ্চ ঝুঁকিতে শিশুরা
দিদারুল ইসলাম হিমেল ও ফারজানা আক্তার রুম্পা দম্পতি তাদের ছয় বছর বয়সী শিশু দাবিরুল ইসলামকে নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করছেন। শিশুটি খিঁচুনিজনিত স্নায়বিক রোগে ভুগছে। এখন অবস্থার উন্নতি হলেও তার কাছে ভীতির নাম ‘উচ্চ শব্দ’। গত বছর থেকে শিশুটি স্কুলে যাচ্ছে। আসা-যাওয়ার পথে গাড়ির হর্নের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সে।
এক দিনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে দিদারুল ইসলাম হিমেল বলেন, ‘গত জুনে সন্তানকে স্কুল থেকে নিয়ে বাসায় ফিরছি। হঠাৎ বিকট শব্দে হর্ন দিয়ে একটি মোটরসাইকেল বিদ্যুৎগতিতে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমার ছেলে চিৎকার করে রাস্তায় বসে পড়ে। সে দুই কানে হাত দিয়ে কান্না করতে থাকে। ভয়ে রাস্তায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। পরে ছেলে শান্ত হলে বলে, ‘বাবা, আমি খুব ব্যথা পেয়েছি।’
নগরের আগ্রাবাদ চৌমুহনী মোড়ে যানজটে দাঁড়িয়ে অনবরত হর্ন দিচ্ছিলেন অটোরিকশাচালক ইদ্রিস মিয়া। গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যালে আটকা, তার পরও কেন হর্ন দিচ্ছেন– জানতে চাইলে তিনি অবলীলায় বলেন, ‘অভ্যাস হয়ে গেছে।’
কয়েক দশকের চিকিৎসার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগংয়ের (ইউএসটিসি) নাক-কান-গলা রোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আব্বাস উদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘পরিবহন শ্রমিকদের অধিকাংশের শ্রবণশক্তি কম। এ কারণে তারা মনে করেন, অন্যদের হয়তো একই সমস্যা হতে পারে। তাই রাস্তায় বারবার হর্ন দিতে থাকেন তারা।’ তিনি বলেন, ‘শব্দদূষণের কারণে শ্রবণশক্তি শুধু কমছে না, স্থায়ী বধিরতাও তৈরি হচ্ছে। শব্দদূষণের বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা। কারণ, তারা শব্দের বিষয়ে সংবেদনশীল।’
পুরো বছরে মাত্র একটি অভিযান
শব্দদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগ নেই বললেই চলে। পুরো বছরের মধ্যে গত ২১ অক্টোবর একটি মাত্র অভিযান চালিয়েছে তারা। অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, ‘আমরা ইটভাটার দূষণ রোধে এখন বেশি ব্যস্ত। তবু অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বৈঠক করে নগরের কিছু এলাকাকে নীরব ঘোষণার জন্য অনুরোধ করেছি।’
- বিষয় :
- শব্দদূষণ
