কুঠিবাড়িতে কুয়াশাঢাকা ভোরে গুড় তৈরির ধুম
জয়পুরহাটের কুঠিবাড়ি এলাকায় গুড় তৈরিতে ব্যস্ত গাছিরা সমকাল
জয়পুরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
জয়পুরহাটে জেঁকে বসেছে শীত। ঘন কুয়াশা আর হালকা হিমেল বাতাসে জনজীবন কিছুটা মন্থর হলেও উৎসবের আমেজ লেগেছে এলাকার খেজুরের বাগানগুলোতে। শীতের এই আমেজকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৫৬ জন গাছির সঙ্গে ৫০০ জন শ্রমিক এখন কুঠিবাড়িসহ বিভিন্ন গ্রামে অবস্থান করছেন। তারা জেলার বিভিন্ন এলাকার প্রায় ১৫ হাজার খেজুর গাছ ভাড়া নিয়ে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজে দিনরাত শ্রম দিচ্ছেন।
বগুড়া থেকে ছয়জনের একটি দল নিয়ে কুঠিবাড়ি এসেছেন গাছি রোস্তম আলী। দম ফেলার সময় নেই তাদের। গভীর রাতে সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। কনকনে হিমেল হাওয়ায় প্রকৃতি নিস্তব্ধ, তখন জয়পুরহাটের মেঠোপথজুড়ে শোনা যায় তাদের পায়ের শব্দ। কোমরে দড়ি বেঁধে, ধারালো হাঁসুয়া আর মাটির কলসি কাঁধে নিয়ে ছোটেন খেজুরের রস সংগ্রহে। আগুনের তাপে গাছের বাকল কেটে ফোঁটায় ফোঁটায় জমা হওয়া রসে তৈরি গুড়ের মিষ্টি সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বোঝা যায়– শীতের এই রিক্ততা ছাপিয়ে গাছিদের হাতেই রচিত হচ্ছে বাংলার এক অনন্য লোকজ ঐতিহ্য।
গাছিরা মাটির কলসি ভর্তি সংগৃহীত রস বড় টিনের তাওয়ায় (কড়াই) ঢেলে তিন থেকে চার ঘণ্টা জ্বাল দেন। তাদের নিপুণ হাতে তৈরি হয় সুস্বাদু পাটালি ও লালি গুড়।
বগুড়া থেকে আসা গাছি রোস্তম আলী জানান, ৩৫০টি গাছ থেকে প্রতিদিন ৩০-৩৫ মণ রস সংগ্রহ করছেন, যা থেকে দৈনিক দুই থেকে তিন মণ গুড় উৎপাদিত হচ্ছে। পুরো মৌসুমে তারা প্রায় ৫০০ মণ গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন।
ভেজালমুক্ত ও খাঁটি গুড় হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা সরাসরি গাছতলায় ভিড় করছেন। পাটালি গুড় একটু ভালো মানেরটা বিক্রি হয় ৪০০ টাকা কেজি। সাধারণ গুড় ২০০ টাকা কেজি আর খেজুরের রস বিক্রি হয় ৬০ টাকা কেজি।
ধলাহার গ্রামের ক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, ‘বাড়িতে আত্মীয় এসেছে, পিঠা বানানোর জন্য খাঁটি গুড় নিতে এখানে এসেছি। এখানকার গুড়ের মান অনেক ভালো।
খেজুরের রসের সঙ্গে নিপা ভাইরাসের ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. আল মামুন। তিনি জানান, রাতে বাদুড় রস খায় বলে কাঁচা রস পান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি সাধারণ মানুষকে কাঁচা রস না খেয়ে ফুটিয়ে অথবা গুড় তৈরি করে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কৃষি বিভাগ থেকেও গাছিদের নেটিং বা জাল ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় এবার প্রায় ১৫ হাজার গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হচ্ছে। শীতের তীব্রতা বাড়ায় গুড়ের চাহিদাও বেড়েছে। আমরা আশা করছি, এই মৌসুমে জেলায় প্রায় ২০০ টন গুড় উৎপাদিত হবে।’ তবে গাছিরা জানিয়েছেন, সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ পেলে এই পণ্যটি আরও বড় পরিসরে বাজারজাত করা সম্ভব হতো।
- বিষয় :
- গুড়
