হলফনামা বিশ্লেষণ
চট্টগ্রামে ৩৩ প্রার্থীর ২৬ জনই লড়বেন ধার-দানের টাকায়
ফাইল ছবি
সারোয়ার সুমন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৪ | আপডেট: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
৪৫৭ কোটি টাকার সম্পদ থাকার পরও স্ত্রী-সন্তানের কাছ থেকে ধার ও দান নিয়ে নির্বাচন করছেন চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরী। চট্টগ্রাম নগরে জামায়াতের সবচেয়ে ধনাঢ্য প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক। আট কোটি টাকার সম্পদের মালিক তিনি। তবু তিনি স্ত্রী আমেনা শাহীনের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা ধার নিয়ে নির্বাচনী খরচ মেটাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন হলফনামায়।
এই দুজনের পথে হেঁটেছেন জামায়াত জোট ও বিএনপির ৯০ শতাংশ প্রার্থী। ১৬টি আসনে ৩৩ প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জনই নির্বাচন করবেন ধার কিংবা দানের টাকায়। জামায়াতের সব প্রার্থীই এই পথে হাঁটলেও ব্যতিক্রম বিএনপির ৭ প্রার্থী। নিজের টাকাতেই নির্বাচন করবেন তারা।
কোটি কোটি টাকার সম্পদ থাকার পরও কেউ জামাতার কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছেন, কেউ দ্বারস্থ হয়েছেন স্ত্রীর। আবার কেউ হাত পেতেছেন ভাই কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছে।
এ ব্যাপারে সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘নিজের সম্পদ থাকার পরও যারা অন্যের দানে নির্বাচন করছেন, ভোটের পর তাদের নানা চাহিদাও মেটাতে হবে প্রার্থীকে। এটি দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে। নিজেদের বিপুল সম্পদ থাকার পরও প্রার্থীরা কেন ধার কিংবা দানে নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর ঘোষণা দিচ্ছেন, সেটার কারণও খতিয়ে দেখা দরকার দায়িত্বশীলদের।’
নিজের টাকায় যারা ভোটের মাঠে
স্বজন কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীর দ্বারস্থ না হয়ে নিজের ব্যবসা, পেশা কিংবা জমানো টাকায় নির্বাচন করবেন বিএনপির সাত প্রার্থী। তাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-ডবলমুরিং-পাহাড়তলী) আসনে সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে সরোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) গোলাম আকবর খোন্দকার, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আবু সুফিয়ান ও চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে জসীম উদ্দীন আহমেদ।
বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও যারা নিচ্ছেন ধার-দান
চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ২৬ কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও নির্বাচনী খরচ মেটাতে ২৫ লাখ টাকা স্বজনের কাছ থেকে দান নিচ্ছেন। ১ কোটি ৪৯ লাখ টাকার সম্পদ থাকার পরও জামাতা সোহেব সরওয়ার থেকে ২০ লাখ টাকা ধার নিয়ে নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিন। চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৮১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। তিনি নির্বাচনের খরচ মেটাতে তাঁর মা, ভাই এবং স্ত্রীর কাছ থেকে ১০ লাখ করে মোট ৩০ লাখ টাকা দান নিচ্ছেন। অন্যদিকে আসলাম চৌধুরী নির্বাচন করতে স্ত্রী জামিলা নাজনীল মাওলার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ধার নিচ্ছেন। আবার ২ লাখ টাকা দান করবেন মেয়ে মেহরীন আনহার উজমাও।
স্ত্রী-সন্তানের দ্বারস্থ হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের প্রার্থী। ১৫ কোটি টাকার সম্পদ থাকার পরও স্ত্রী তাহেরা আলমের কাছ থেকে তিনি ১০ লাখ টাকা ধার নেবেন। চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে এরশাদ উল্লাহ ২৪ কোটি টাকার সম্পদের মালিক। তবু তিনি স্ত্রীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা দান নেবেন। চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) আসনের প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজামেরও ৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার সম্পদ আছে। তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলের কাছ থেকে দান নেবেন ৯ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে নাজমুল মোস্তফা আমীন ৩ কোটি টাকার সম্পদ থাকার পরও নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে স্ত্রী ও ছেলের কাছ থেকে দান নিচ্ছেন ৩৫ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে মিশকাতুল ইসলাম সাড়ে ১৩ কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও তাঁর স্ত্রী আনিলা ইসলাম চৌধুরী তাঁকে দান করবেন ১৫ লাখ টাকা।
জামায়াত প্রার্থীরা নির্বাচনী ব্যয় মেটাবেন দানের টাকায়
৫১ লাখ ৭০ হাজার টাকার মালিক হলেও নির্বাচনী খরচ মেটাতে চট্টগ্রাম-১ আসনের জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান তাঁর ভাই, ভগ্নিপতি ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ধার-দান নেবেন ১৪ লাখ টাকা। ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার সম্পদ থাকা চট্টগ্রাম-২ আসনের মোহাম্মদ নুরুল আমিন তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও তিনজন শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা দান হিসেবে নেবেন। চট্টগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ আলা উদ্দীন সিকদার তাঁর ভাই, ভগ্নিপতি ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ১৯ লাখ টাকা দান হিসেবে নেবেন। তিনি নিজে খরচ করবেন ৫ লাখ টাকা। অথচ তাঁর সম্পদ আছে ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার।
চট্টগ্রাম-৪ আসনের প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিক তাঁর ভাই, শ্বশুর ও শুভাকাঙ্খীর কাছ থেকে ধার ও দান নেবেন ২০ লাখ টাকা। তাঁর আছে ৪৩ লাখ টাকার সম্পদ। চট্টগ্রাম-৫ আসনের জামায়াত জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মো. নাসির উদ্দিন নিজের ভাইয়ের কাছ থেকে দান এবং চাচাতো ভাই ও এক ব্যক্তির কাছ থেকে ধার নিয়ে নির্বাচনী ব্যয় মেটাবেন। অথচ তাঁর ৮৫ লাখ ৯৫ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে। চট্টগ্রাম-৬ আসনের শাহজাহান মঞ্জু ভায়রা ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা দান হিসেবে নেবেন। চট্টগ্রাম-৭ আসনের ডা. এটিএম রেজাউল করিম স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা দান হিসেবে পাবেন। তাঁর আছে ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকার সম্পদ। চট্টগ্রাম-৮ আসনের ডা. আবু নাছের তাঁর ভাই ও সম্বন্ধীর কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা দান হিসেবে নেবেন। অথচ তিনি ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকার সম্পদের মালিক।
চট্টগ্রাম-১০ আসনের শামসুজ্জামান হেলালী স্ত্রী, বড় ভাই, ভগ্নিপতি ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ধার ও দান হিসেবে নেবেন ৩৩ লাখ টাকা। তাঁর আছে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার সম্পদ। চট্টগ্রাম-১১ আসনের শফিউল আলমের ভাই, শাশুড়ি, শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ধার-দান হিসেবে নেবেন ৩৯ লাখ টাকা। তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম-১৩ আসনে মাহমুদুল হাসান ভাই, ফুফাতো ভাই ও তিনজন শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা দান হিসেবে নেবেন। তাঁর সম্পদ আছে ৭৯ লাখ টাকার। চট্টগ্রাম-১৪ আসনে জামায়াত জোটের এলডিপির প্রার্থী ওমর ফারুক তাঁর স্ত্রী সাবিনা শরমিনের কাছ থেকে দান হিসেবে নেবেন ৫ লাখ টাকা। তাঁর ৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শাহজাহান চৌধুরী দুই ভাই, ভায়রা ভাই ও তিন শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে দান হিসেবে নেবেন ৪০ লাখ টাকা। তিনি ২ কোটি টাকা সম্পদের মালিক। চট্টগ্রাম-১৬ আসনে মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম দুই ভাই ও দুই শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা দান হিসেবে নেবেন। তিনি নিজে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকার সম্পদের মালিক।
- বিষয় :
- হলফনামা
