ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ঝিনাইদহে মিলছে না জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন, দুর্ভোগ

ঝিনাইদহে মিলছে না জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন, দুর্ভোগ
×

মাগুরা থেকে কেনা ভ্যাকসিন নিচ্ছে ৭ মাসের অরিত্র। বুধবার ঝিনাইদহ সদরে সমকাল

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঝিনাইদহ জেলাজুড়ে মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে জলাতঙ্ক রোগপ্রতিরোধী র‍্যাবিস ভ্যাকসিনের। সদর হাসপাতালসহ জেলার পাঁচটি সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিনটির সরবরাহ নেই। এমনকি এটি ফার্মেসিতেও পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে পাশের জেলা থেকে সংগ্রহ করে শরীরে প্রয়োগ করছেন রোগীরা। তবে কবে নাগাদ ভ্যাকসিনের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে– এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছেন না স্বাস্থ্য বিভাগ ও বেসরকারি ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তারা। 

সাধারণত একটি ভায়াল থেকে চারজনের শরীরে প্রয়োগ করা যায় র‍্যাবিস ভ্যাকসিন। কুকুর ও বিড়ালের আঁচড় ও কামড়ানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শরীরে ভ্যাকসিনটি দিতে হয়। এ  ধরনের ক্ষত থেকে জলাতঙ্ক রোগ হতে পারে। ভ্যাকসিনটি শরীরের মাংসপেশিতে দিলে চার ডোজে এবং চামড়ার নিচে দিলে তিন ডোজের মাধ্যমে শেষ হয়। শঙ্কার বিষয়, কারও জলাতঙ্ক রোগ দেখা দিলে তাঁর কোনো চিকিৎসা নেই। ফলে মৃত্যু অনিবার্য।   

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে বিড়াল ও কুকুরের আঁচড়-কামড়ানোসহ অন্যান্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ জন রোগী আসেন। জলাতঙ্ক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসাবে এসব রোগীর শরীরে র‍্যাবিস ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালের ভ্যাকসিনের মজুত ফুরিয়ে গেছে। এতে বেসরকারি কোম্পানির ভ্যাকসিনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দু-এক দিনের মধ্যে জেলায় ভ্যাকসিনের সংকট দেখা দেয়। ফার্মেসিতে থাকা মজুতও গত মাসে শেষ হয়ে গেছে। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সদর হাসপাতালে ভ্যাকসিন না পেয়ে অন্তত ৪০ জন রোগী ফিরে গেছেন। একই দিন পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে শরীরে প্রয়োগ করেন অন্তত ৫২ জন রোগী। 

জেলার শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ দিন ধরে র‍্যাবিস ভ্যাকসিনের সরবরাহ নেই। একই অবস্থা কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, হরিণাকুণ্ড ও কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, জেলা শহর ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বাজারের ফার্মেসিতে র‍্যাবিস ভ্যাকসিন মিলছে না। এমনকি শৈলকুপা, হরিণাকুণ্ডু, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, কালীগঞ্জ উপজেলার ওষুধ ফার্মেসিগুলোতেও নেই ভ্যাকসিনের সরবরাহ। দু-একটি দোকানে থাকলেও তা খুবই গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে। 

সদর হাসপাতালে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেউ অনলাইনে অর্ডার করে, কেউ পার্শ্ববর্তী মাগুরা, কুষ্টিয়া, খুলনা প্রভৃতি জেলার ফার্মেসিতে গিয়ে ভ্যাকসিনটি কিনে শরীরে প্রয়োগ করছেন। এ জন্য অর্থ ব্যয়, ভোগান্তি যেমন বেড়েছে, তেমনি চাহিদামতো না পেয়ে রোগ সংক্রমণের শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। 
সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কবে নাগাদ ভ্যাকসিনের বরাদ্দ পাওয়া যাবে, তা বলতে পারছেন না তারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় জরুরিভাবে উদ্যোগ না নিলে দ্রুত সংকটের  সমাধান হবে না। বেসরকারিভাবে ইনসেপ্টা ও পপুলার ফার্মাসিউটিক্যাল র‍্যাবিস ভ্যাকসিন তৈরি করে থাকে। তারাও ফার্মেসিতে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না। এসব ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা বলতে পারছেন না কবে নাগাদ ভ্যাকসিনের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।  

শহরের ষাটবাড়িয়া থেকে সদর হাসপাতালে সাত মাসের সন্তান অরিত্রকে নিয়ে এসেছিলেন অপূর্ব কুমার। তিনি বলেন, বাচ্চাকে বিড়ালে হাতে আঁচড় দিয়েছিল। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ভ্যাকসিন দিতে বলেছেন। এরপর জেলা শহরসহ কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে ভ্যাকসিন পাননি। 
স্কুল থেকে ফেরার পথে সাত বছরের শিশু মারুফকে পায়ে কামড় দেয় কুকুর। পরদিন তার দাদি সখিনা বেগম শিশুটিকে সঙ্গে করে সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন ভ্যাকসিন দিতে। কোথাও খুঁজে না পেয়ে সাতক্ষীরা থেকে ভ্যাকসিন আনা এক ব্যক্তির সঙ্গে শেয়ার করে ভ্যাকসিন দেন। 
সদর হাসপাতালের টিকাদান কক্ষে কাজ করা উমায়ের হোসেন বলেন, প্রতিদিন অনেক রোগী আসছেন। কেউ বাহির থেকে ভ্যাকসিন কিনে আনতে পারলে তাঁর শরীরে প্রয়োগ করা হচ্ছে। কারণ সরকারিভাবে এই ভ্যাকসিনের সরবরাহ নেই। 

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের ঝিনাইদহ এরিয়া ম্যানেজার আবুল বাশার জানান, কোম্পানি বার্ষিক একটি টার্গেট নিয়ে ভ্যাকসিন তৈরি করে। কিন্তু হঠাৎ করে সরকারি সরবরাহ না থাকায় অতিরিক্ত চাপ বেড়ে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা বলতে পারছেন না। একই মন্তব্য পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালসের এরিয়া ম্যানেজার গিয়াস উদ্দিনেরও।
রোগীদের দুর্ভোগের কথা স্বীকার করে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এস এম আশরাফুজ্জামান সজীব বলেন, কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জানুয়ারি মাসেও সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। 
সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, হাসপাতাল ও ফার্মেসি– কোথাও র‍্যাবিস ভ্যাকসিন নেই। ভ্যাকসিনের সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। 

আরও পড়ুন

×