ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বগুড়ার চালকল মালিকদের অভিযোগ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে

চালে টনপ্রতি ঘুষ বেড়েছে ৭০০ টাকা

তদন্ত কমিটি করলেন জেলা প্রশাসক

চালে টনপ্রতি ঘুষ বেড়েছে ৭০০ টাকা
×

 এস এম কাওসার, বগুড়া

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়ায় গুদামে চাল সরবরাহের জন্য মিল মালিকদের কাছে টনপ্রতি নতুন করে ৭০০ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এর প্রতিকার চেয়ে মিলাররা খাদ্য উপদেষ্টা, খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেছেন। ঘুষ বন্ধ করা না হলে চাল সরবরাহ করবেন না বলে জানিয়েছেন মিলাররা। তাদের অভিযোগ পেয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক।

চালকল মালিকরা বলছেন, তারা চাল সরবরাহের ক্ষেত্রে আগে থেকেই টনপ্রতি ২৫০ টাকা ঘুষ দিয়ে আসছেন। এখন আরও ৭০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত বরাদ্দের চাল সরবরাহের ক্ষেত্রে আগে থেকেই টনপ্রতি এক হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হচ্ছে।

বগুড়ার চালকল মালিক সমিতি গত ২৮ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসকের (জেলা ধান-চাল ক্রয় কমিটির সভাপতি) কাছে ও মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছে। এতে বলা হয়, ৯ ডিসেম্বর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি-ফুড) সাইফুল কাবির খান, সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (টিসিএফ) মো. হারুন অর রশিদ ও সদর খাদ্যগুদাম কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম মিলারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে খাদ্য কর্মকর্তারা মিলারদের সঙ্গে সম্পাদিত ক্রয়চুক্তি অনুসারে প্রতি টন চালে ৫০ টাকা, ফাইল মুভমেন্টের জন্য টনপ্রতি ২০০ টাকা এবং চুক্তি করা চাল গুদামে সরবরাহ বাবদ টনপ্রতি ৭০০ টাকা দাবি করেন। এ ছাড়া মিলারদের জামানতের টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য টনপ্রতি ২০০ টাকা, পুনর্বরাদ্দের (অতিরিক্ত) জন্য টনপ্রতি ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা দাবি করেন। পুরো জেলার ৬৯১ মিলারের কাছে দাবি করা টাকা বগুড়া সদরের গুদাম কর্মকর্তা আতিকুল ইসলামের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। মিলাররা প্রতিবাদ করলে তাদের বৈঠক থেকে বের করে দেওয়া হয়। 

খাদ্য বিভাগ থেকে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ৩৬ হাজার ২৬৯ টন চাল কিনতে ৬৯১ মিলারের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাল ক্রয় অভিযান চলবে।
মিলারদের অভিযোগ, নতুন করে টনপ্রতি ৭০০ টাকা ঘুষ দাবি করছেন কর্মকর্তারা। এতে ৩৬ হাজার ২৬৯ টন চালের বিপরীতে ঘুষ দিতে হবে ২ কোটি ৫৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩০০ টাকা। এতে তাদের লোকসান গুনতে হবে।

জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছাইদুর রহমান বলেন, ‘জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আমাদের ৯ ডিসেম্বর দুপুরে দাওয়াতের কথা বলে ডেকে নিয়ে সেখানে সদর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ ও গুদাম কর্মকর্তা আতিকুল ইসলামের মাধ্যমে টনপ্রতি ৭০০ টাকা ঘুষ দাবি করেন। এই টাকা সদর খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার কাছে জমা দিয়ে গুদামে চাল দিতে নির্দেশ দেন। আমরা বৈঠকে এর প্রতিবাদ করায় আমাদের বের করে দেন তিনি।’
এদিকে, চাল ক্রয়ের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াও অতিরিক্ত চাল কেনা হয় এ জেলায়। এবার প্রায় ১ হাজার ৮০০ টন অতিরিক্ত চাল কেনা হচ্ছে। এই চাল সরবরাহ করতে মিলারদের কাছ থেকে টনপ্রতি ১ হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার কর্ণফুলি চালকলের মালিক মোনায়েম খান বলেন, ‘আমি সাড়ে ৮ টন অতিরিক্ত বরাদ্দ নিয়েছি। এর জন্য টনপ্রতি ১ হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। এছাড়া নতুন করে টনপ্রতি ৭০০ টাকা দাবি করছেন কর্মকর্তারা। একই অভিযোগ করেন দুচঁচাচিয়া উপজেলা মিল মালিক সমিতির সভাপতি মোবারক হোসেনও। তিনি বলেন, এর প্রতিকার না পেলে আমরা চাল দেওয়া বন্ধ করতে বাধ্য হবো।
জেলা অটো মেজর এন্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি এটিএম আমিনুল হক বলেন, ‘জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বৈঠক ডেকে সদর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা এবং গুদাম কর্মকর্তাকে দিয়ে ঘুস দাবি করেন। বৈঠক ডেকে শুধু তিনি উদ্বোধনী বক্তব্য দিয়ে চলে যান। চলে যাওয়াটা ছিল তার কৌশল।’ তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে মিলাররা ১৬ ডিসেম্বর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। উলটো ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। জেলা প্রশাসকের কাছেও প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। সমাধান না হলে আন্দোলন করতে বাধ্য হবেন তারা।
বগুড়া সদর খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডিসি ফুডের নির্দেশে বৈঠকের আয়োজন এবং চা নাস্তার ব্যবস্থা করেছিলাম। ঘুস দাবি করা কিংবা ঘুসের টাকা আমার কাছে জমা দেয়ার কোন ঘটনা ঘটেনি।’ সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘বৈঠকে আমাদের সঙ্গে মিলারদের কোনো সমস্যা হয়নি। আমি ঘুসের বিষয়ে কিছুই জানি না।’ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সাইফুল কাবির খান বলেন, ‘গত ৯ ডিসেম্বর মিলারদের সঙ্গে বৈঠকটি উদ্বোধন করেই আমি বেরিয়ে গেছি। পরে শুনেছি একটি ভুল বুঝাবুঝির ঘটনা ঘটেছে।’ 
জেলা ধান-চাল ক্রয় কমিটির সভাপতি ও ডিসি তৌফিকুর রহমান বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×