ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে ২৮ ইটভাটা
নেত্রকোনার রামপুরে কেন্দুয়া-নেত্রকোনা সড়কের পাশে এনএনবি ব্রিকসে পোড়ানো হচ্ছে ইট সমকাল
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নেত্রকোনা জেলায় ৪০টি ইটভাটা রয়েছে। চলতি বছর চালু আছে ৩২টি। এর মধ্যে মাত্র চারটির ছাড়পত্র আছে। বাকি ২৮টি ভাটা অবৈধ। স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে ম্যানেজ করে অবৈধ ভাটাগুলো চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, মামলা জটিলতায় এসব ইটভাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না।
চলতি মৌসুমের শুরুতে ছয়টি ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কিন্তু বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সেই ছয়টি ভাটাতেও এখন ইট পোড়ানোর কার্যক্রম চলছে।
এদিকে স্থানীয়দের ম্যানেজ করে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির উপরিভাগ, খাসজমি, নদীর চর, বিল ও খালের মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। এসব মাটি পরিবহনে প্রতিনিয়ত ট্রাক্টর চলাচল করায় গ্রামীণ রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইটভাটার ধোঁয়ায় আশপাশের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফসলি জমি হারাচ্ছে উর্বরতা।
জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ইটভাটা মালিক সংগঠনের তথ্যমতে, নেত্রকোনার ৯টি উপজেলায় ৪০টি ইটভাটা রয়েছে। এ বছর ৩২টি ভাটা ইট উৎপাদন করছে। এর মধ্যে চারটি ভাটার পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে। বাকি ২৮টি ভাটা অবৈধভাবেই ইট তৈরি করছে। প্রতিটি ভাটায় কাজ করে ৩০০-৪০০ শ্রমিক। প্রতিটি ভাটায় ৬৫ লাখ থেকে এক কোটির বেশি ইট উৎপাদন হয়।
উচ্চ আদালতের আদেশের তথ্যমতে, পরিবেশবাদী সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’-এর পক্ষে ২০২৩ সালে ১০ নভেম্বর উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই বছরের ১৩ নভেম্বর দেশের অবৈধ সব ইটভাটা বন্ধ করতে আদেশ দেন। এই আদেশে মন্ত্রীপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও পরিবেশ সচিবকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তবে নেত্রকোনার কোথাও ইটভাটা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের ৪ ধারায় বলা আছে, ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত, সেখানকার জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স ছাড়া কোনো ব্যক্তি ইটভাটা স্থাপন ও ইট প্রস্তুত করতে পারবেন না। ওই আইনের ৮(১) ধারায় বলা আছে, ছাড়পত্র থাকুক বা না থাকুক, আইন কার্যকরের পর আবাসিক বাণিজ্যিক ও সংরক্ষিত এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান, জলাভূমি, কৃষিজমি এবং বিশেষ কোনো স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অনুরূপ কোনো প্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু নেত্রকোনার অনেক ইটভাটা স্থাপনে এই নিয়ম মানা হয়নি। এসব ইটভাটা থেকে সড়ক, জনবসতি, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব খুবই কম।
সরেজমিন আটপাড়া, কেন্দুয়া, নেত্রকোনা সদরের কয়েকটি ইটভাটা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভাটার পাশেই ফসলি জমি, বিদ্যালয়, কলেজ, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, সড়ক, রেললাইন ও জনবসতি আছে। আটপাড়া মাটিকাটা গ্রামের কাঞ্চন, স্কুলশিক্ষার্থী সাব্বির ও তাজবীদ জানায়, নেহল ব্রিকস নামে ইটভাটার ধুলাবালুতে ভোগান্তি পোহাতে হয়।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কয়েকটি ইটভাটার মালিকপক্ষের লোকজন বলেন, ভাটা পরিচালনা করতে অনেক কষ্ট হয়। কিছু সাংবাদিক আছেন যাদের টাকা না দিলে প্রশাসন দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করান। আবার সংশ্লিষ্ট প্রতিটি অফিসকে ডিফা গুঞ্জা (টাকা) দিয়ে ম্যানেজ করে ইটভাটা চালাতে হয়।
কেন্দুয়ার ভগবতীপুর গ্রামের কয়েকজন জানান, রাস্তা ও বসতবাড়ির আশপাশে ইটভাটার ধুলাবালু ও কয়লার কণা উড়ে আসে। এতে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগে ভুগছে। ফল গাছের ফলন, ফসলি জমিতে ধান ও সবজির ফলন আগের থেকে কমে গেছে। গত বছর প্রশাসন ‘ঢাকা ব্রিকস’ নামে ইটভাটাটি বন্ধ করলেও পরদিন মালিকপক্ষ আবার চালু করে। প্রশাসনকে জানিয়ে কোনো লাভ হয় না। উল্টো ভাটার মালিক পক্ষের হুমকি-ধমকিতে এলাকায় থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে।
নেত্রকোনা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, জেলার ইটভাটায় প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সমসংখ্যক পরিবারের জীবিকাও নির্বাহ হচ্ছে। তিনি মনে করেন, সরকার নীতিমালা সহজ করে ইটভাটা শিল্পকে রক্ষা করতে উদ্যোগ নেবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সদস্য ও এআরএফবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান দেলোয়ার খানের ভাষ্য, মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধিমোতাবেক যেসব ইটভাটা চলতে পারবে না সেগুলো প্রশাসনের বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী অহিদুর রহমান বলেন, প্রকৃতিকে বাঁচানোর জন্য বিধিমোতাবেক ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনা করা উচিত। কিন্তু অনেকেই তা মানছেন না। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
নেত্রকোনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মতিন বলেন, জেলায় ৩২টি ইটভাটা চালু আছে। এর মধ্যে চারটির পরিবেশের ছাড়পত্র রয়েছে। এ বছর কেন্দুয়া চারটি, মদনে দুটি ও আটপাড়ায় দুটি ভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। মামলা জটিলতার কারণে অবৈধ ভাটাগুলো বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমানের ভাষ্য, পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে অবৈধ ইটভাটায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জরিমানা করছে। খাসজমি, নদী ও বিলের মাটি কেটে ইটভাটায় মাটি নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- ইটভাটা
