লোকলজ্জা উপেক্ষা করে আরজু এখন স্বাবলম্বী
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে পত্রিকা বিক্রি করে সংসার চালান আরজু বেগম সমকাল
আজিজুল হক সরকার, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সংসারের অভাব-অনটন যখন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছিল, তখন লোকলজ্জা আর সামাজিক অপবাদকে তুড়ি মেরে জীবনযুদ্ধে নেমেছিলেন আরজু বেগম। আজ থেকে ৯ বছর আগে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার প্রথম নারী হকার হিসেবে সংবাদপত্র বিক্রির পেশা শুরু করেন। আজ তিনি শুধু একজন স্বাবলম্বী নারীই নন, বরং সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।
চক শাহাবাজপুর গ্রামের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী আরজু বেগমের স্বামী আশরাফুল আলম বাবু সাত বছর নিরুদ্দেশ ছিলেন। ঘরে দুই মেয়েকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছিলেন। একাই টেনেছেন সংসারের ঘানি। একসময় দর্জির কাজ করলেও তাতে দুই মেয়ের পড়াশোনা আর অন্য খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। এমন সংকটময় মুহূর্তে ৯ বছর আগে এজেন্ট মোন্নাফ আলীর পরামর্শে পত্রিকা বিক্রির চ্যালেঞ্জিং পেশা বেছে নেন।
শুরুটা সহজ ছিল না। একজন নারী হয়ে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি পত্রিকা বিলি করাকে সমাজ শুরুতে বাঁকা চোখে দেখেছিল। অপবাদ আর গ্লানি সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। এতে দমে যাননি আরজু বেগম। প্রতিদিন ভোরে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ থাকে, তখনই তিনি ঘুম থেকে উঠে পড়েন। শুরুতেই গরু ও ছাগলগুলোর যত্ন নেন। গৃহস্থালি কাজ শেষ করে বাইসাইকেলে চেপে গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ফুলবাড়ী শহরে আসেন। এজেন্টের কাছ থেকে সংবাদপত্র সংগ্রহ করে তিনি বেরিয়ে পড়েন শহর ও গ্রামের ৯টি ওয়ার্ডে। সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০টি পত্রিকা পাঠকদের হাতে পৌঁছে দেন। টানা কয়েক ঘণ্টা পরিশ্রমের পর দুপুর পর্যন্ত পত্রিকা বিলি শেষ করে তিনি বাসায় ফিরে আসেন। এক সময়ের অভাবী আরজু বেগম এখন কর্মস্পৃহা আর সাহসের ওপর ভর করে প্রতিদিন এই রুটিন মেনেই নিজের সংসার ও জীবনকে সফলতার পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
যখন প্রযুক্তির চাপে অনেক পুরুষ হকার এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন, তখন আরজু বেগম এই পেশা দিয়েই নিজের ভাগ্য বদলেছেন। তাঁর সফলতার খতিয়ান ঈর্ষণীয়। পত্রিকা বিক্রির আয়ে বড় করেছেন এবং অনার্সে পড়িয়েছেন দুই মেয়েকে। সম্মানজনকভাবে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন নিজের পাকা বাড়ি। বর্তমানে তাঁর রয়েছে ৩টি গরু ও ২টি ছাগল। মাসে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করে বেশ সচ্ছল জীবন কাটাচ্ছেন তিনি।
আরজু বেগমের এই অদম্য স্পৃহা দেখে প্রতিবেশী আনজেমা বেগম বলেন, ‘আগে ওর অবস্থা খুব খারাপ ছিল। এখন ও নিজের চেষ্টায় সচ্ছল।’ পত্রিকা এজেন্ট মোন্নাফ আলী জানান, আরজু বেগমের দায়িত্ববোধ আর সময়ানুবর্তিতা প্রশংসনীয়। নারী হওয়ার কারণে পাঠকরাও সানন্দে নিয়মিত বিল পরিশোধ করে দেন।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা রীতা মণ্ডল বলেন, ‘একজন নারী সব পেশাতেই পারদর্শী হতে পারেন। আরজু বেগমের এই উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’ অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ হাছান তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘কাজ মানুষকে সম্মানিত করে। আরজু বেগম আমাদের সমাজের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।’
- বিষয় :
- সংসার
