জঙ্গল সলিমপুর
আগে থেকেই সন্ত্রাসীদের টার্গেট ছিলেন মোতালেব
ছয় মাস ধরে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন তিনি
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব সদস্য হতাহতের ঘটনায় সন্ত্রাসীদের শাস্তির দাবিতে গতকাল বিকেলে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন এলাকাবাসী -সমকাল
আব্দুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫১ | আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে আসছিল র্যাব। অভিযানের জন্য সাদা পোশাকে তথ্য সংগ্রহে আগেও কয়েকবার সেখানে গিয়েছিলেন নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। তিনি ছিলেন র্যাব-৭ গোয়েন্দা টিমের প্রধান। এ জন্য তাঁকেই টার্গেট করেছিল সন্ত্রাসীরা।
গত সোমবার সন্ত্রাসী ইয়াসিনকে ধরতে বিএনপির কার্যালয়ে প্রবেশ করলে সেখানেই মোতালেবসহ চার র্যাব সদস্যকে আটক করে বেধড়ক পেটায় সন্ত্রাসীরা। এক পর্যায়ে তাদেরকে ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গহিন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যায় তারা। সেখানে আরেক দফা পেটানো হয় তাদের। পুলিশ এসে পরে চারজনকে উদ্ধার করলেও বাঁচানো যায়নি মোতালেবকে।
এদিকে র্যাব কর্মকর্তার এমন মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। র্যাবের মহাপরিচালক গতকাল চট্টগ্রামে এসে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে জঙ্গল সলিমপুরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় কম জনবল নিয়ে র্যাবের অভিযান পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ৪০০ থেকে ৫০০ দুষ্কৃতকারী ঘটনাস্থলে থাকলেও র্যাব কীভাবে ৫২ সদস্য নিয়ে সেখানে গেল– এমন প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বিপুলসংখ্যক ও বিক্ষিপ্ত জনগোষ্ঠীর বসবাস। স্থানীয় লোকজনের তুলনায় বাইরের এলাকা থেকে আসা মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অল্প সংখ্যক জনবল নিয়ে অভিযান পরিচালনা করলে ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের এলাকায় ভবিষ্যতে আরও পরিকল্পিতভাবে এবং অধিক সংখ্যক ফোর্স নিয়ে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে। এ ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি ও কোনো গ্রেপ্তার নেই বলে জানান তিনি। তবে কারা এ ঘটনায় যুক্ত, তাদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
হামলা হয় মাইকে ঘোষণা দিয়ে
ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, র্যাবের দুটি মাইক্রোবাস সলিমপুরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে লাঠিসোটা নিয়ে কিছু ব্যক্তি ঘিরে ধরার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে মাইক্রোবাস দুটির কাচ ভাঙচুর করে তারা। হামলার সময় ওই এলাকায় মাইকে ঘোষণা দেওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ঘোষণায় এলাকার ফটক আটকানোর জন্য বলছিল এক ব্যক্তি। র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করে র্যাব। এ সময় তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ দৃষ্কৃতকারী র্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
আগে থেকেই টার্গেটে ছিলেন মোতালেব
র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের নেতৃত্ব দেওয়া দুই বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তারে গত ছয় মাস ধরে পরিকল্পনা করছিল র্যাব। সন্ত্রাসীদের তথ্য সংগ্রহে সে এলাকায় একাধিকবার গিয়েছিলেন নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। তখনই তাঁকে টার্গেট করেছিল সন্ত্রাসী বাহিনী।
গত সোমবার র্যাবের গাড়ি জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রাসীরা সেখানে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে। র্যাব অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই আক্রমণের মুখে পড়ে। এক পর্যায়ে মোতালেব এবং তাঁর টিমের সদস্য কনস্টেবল রিফাত, নায়েক আরিফ ও ল্যান্স নায়েক এমামকে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের নির্মমভাবে পেটানো হয়। মোতালেবকে পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে বসে আছেন আহত কয়েক র্যাব সদস্য। তাদের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যান্ডেজ। কক্ষের মেঝে রক্তে লাল হয়ে আছে। পুলিশ আহত র্যাব সদস্যদের গাড়িতে তুলে দিচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে র্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, মোতালেবের কাছে জঙ্গল সলিমপুরে সক্রিয় সন্ত্রাসীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য ছিল, যা সন্ত্রাসীদের কাছেও জানা ছিল। তাই তাঁকে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে কম লোকবল নিয়ে অভিযানে প্রশ্ন
জঙ্গল সলিমপুর দেশের মধ্যে একটি নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত। যেখানে প্রবেশ করতে হলে সেখানকার সন্ত্রাসী বাহিনীদের অনুমতি নিতে হয়। তাদের অনুমতি ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা যায় না। এর আগে অবৈধ উচ্ছেদ, পাহাড় কাটা ঠেকানো ও সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারে গিয়ে একাধিকবার বাধার মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন। সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে কম সংখ্যক সদস্য নিয়ে অভিযান পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুরুতে র্যাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অভিযানে ৪৫ জন সদস্য ছিল। গতকাল নিহত র্যাব সদস্যের জানাজা শেষে মহাপরিচালক দাবি করেছেন, ৫০ জন সদস্য ছিল। বাস্তবে এ সংখ্যা কম ছিল বলে দাবি একাধিক কর্মকর্তার। ঘটনার ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজেও দুটি মাইক্রোবাস দেখা গেছে। কম সংখ্যক সদস্য নিয়ে অভিযান পরিচালনা করায় র্যাবের অভ্যন্তরেও রয়েছে অসন্তোষ।
র্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান বলেন, জনবল একেবারে কম ছিল না; ৫০ জনের ওপরে। আমাদের যে পরিকল্পনা ছিল তাতে অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করা যাবে– এ ধরনের একটা ধারণার বশবর্তী হয়ে অভিযান পরিচালনা করি। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা অনুসন্ধান করে দেখবে, অভিযানে কোনো ভুলত্রুটি ছিল কিনা। যদি কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়, ভবিষ্যতে সেটা সংশোধন করে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
জানাজা শেষে র্যাবের ডিজি বলেন, এ ঘটনার সুষ্ঠ বিচার না হওয়া পর্যন্ত র্যাব এর পেছনে লেগে থাকবে। জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। আমরা খুব শিগগিরই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখানে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছে এবং সন্ত্রাসী আছে তাদের নির্মূল করব। অবৈধ কর্মকাণ্ডের এই আস্তানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব।
জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, এপিবিএন, জেলা পুলিশ– সবাই মিলে অভিযান চালানো হবে। যতদিন লাগে সন্ত্রাসীদের এই অভয়াশ্রম আমরা নির্মূল করব। তারা কোনোভাবেই রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নয়।
‘আব্বুকে যারা মেরেছে তাদের ফাঁসি চাই’
ছোট্ট একটি শামিয়ানা টানানো হয়েছে চট্টগ্রামের র্যাব-৭ কার্যালয়ের মাঠে। সেখানে ময়নাতদন্ত শেষে আনা হয়েছে র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার নিথর দেহ। অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর স্ত্রী সামসুন্নাহার। সেখানে অঝোরে কাঁদছিলেন অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ছেলে মেহেদী হাসান, এসএসসি পরীক্ষার্থী বড় মেয়ে শামীমা জান্নাত ও ৫ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছোট মেয়ে ইশরাত জাহান। সাংবাদিকদের ইশরাত জাহান বলে, আমার আব্বুকে যারা মেরেছে তাদের ফাঁসি চাই।
আহাজারিরত সামসুন্নাহার বলেন, ‘আমার স্বামী দেশকে অনেক ভালোবাসতেন। দেশের কাজে পড়ে থাকতেন। তিনি চাইলে পালিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়েছেন। আমি এ ঘটনার সঠিক বিচার চাই। জড়িতদের ফাঁসি চাই।’
বিচার প্রসঙ্গে র্যাবের মহাপরিচালক বলেন, যারা দায়ী তাদের আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসব। কথা দিতে চাই– মামলার বিচারের রায় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত র্যাব পুরো বিষয় মনিটরিং করবে।
নতুন বাড়িতে থাকা হলো না মোতালেবের
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেনের মরদেহ কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার কালিরবাজার ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। এ সময় র্যাব কর্মকর্তা, সহকর্মী ও এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মোতালেব অলিপুর গ্রামের প্রয়াত আবদুল খালেক ভূঁইয়ার ছেলে। ৮ ভাই ৩ বোনের মধ্যে সবার ছোট মোতালেব বিজিবিতে যোগদান করেন ১৯৯৩ সালে। দুই বছর আগে তিনি র্যাবে পোস্টিং নেন। রাজধানীর পিলখানা এলাকায় তাঁর বাসা।
গতকাল বিকেলে গ্রামের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, মরদেহ দেখতে স্বজন ও প্রতিবেশী বাড়িতে ভিড় করছেন। নিহতের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম আহাজারি করে বলেন, শুক্রবার আমার ভাই বাড়িতে এসেছিল। চট্টগ্রামে যাওয়ার সময় তার বড় মেয়ে বারবার বলছিল, আব্বু আজ যেয়ো না। মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে মোতালেব বলেছিল, সরকারি কাজ, যেতেই হবে। মেয়েটি কান্না বুকে জমা রেখেই বাবাকে বিদায় দেয়।
তিনি আরও বলেন, ভাই বাড়িতে একটি পাকা ঘর তৈরি করছে। মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসত। অবসরে পরিবার নিয়ে এ ঘরে উঠবে বলে জানিয়েছিল। কিন্তু ভাইয়ের নতুন ঘরে ওঠা হলো না।
মোতালেবের বড় ভাই জাকির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, পরিবারের ছোট হওয়ায় সে ছিল খুব আদরের। ছোটবেলা থেকেই ছিল বেশ সাহসী– জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করে গেল।
গ্রামের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোজাহিদ হোসেন, কর্নেল নাজমুল হাসান, কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান, র্যাব-১১ (নারায়ণগঞ্জ) এর সিইও লেফটেনেন্ট কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন, র্যাব-১১ কুমিল্লা ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাদমান ইবনে আলম।
