ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঠাকুরগাঁও-১

একজনের ‘শেষ’ নির্বাচন, আরেকজনের প্রথম

একজনের ‘শেষ’ নির্বাচন, আরেকজনের প্রথম
×

ঠাকুরগাঁও সদরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গণসংযোগ। বুধবার তোলা- সমকাল

 জাহিদুর রহমান, ঠাকুরগাঁও থেকে 

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

রংপুর শহর থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। হালকা কুয়াশায় মোড়া ভোরে বিভাগীয় শহর থেকে যাত্রা শুরু। রাস্তার দুই পাশে কৃষিজমি, খাল আর দোকানপাট। দূরত্ব যতই কমছে, ততই নদীবিধৌত এই জনপদের ঘুম ভাঙছে, জেগে উঠছে ঠাকুরগাঁও। দিনের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কর্ণফুলী বাজারে জমে উঠেছে অন্যরকম এক হাট। কোনো সবজি নেই, নেই চাল-ডাল কিংবা মাছ-মাংস। এখানে মানুষই পণ্য। সারি সারি শ্রমিক অপেক্ষা করছেন খরিদ্দারের জন্য। ধান কাটা, নির্মাণকাজ, রঙের কাজ, কাঠমিস্ত্রি, কৃষি ক্ষেতের দিনমজুর– সব ধরনের শ্রমিক আছেন। দরদাম চলে পুরোনো দিনের মতোই– চোখে চোখ রেখে।

শ্রমের হাটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ জানেন, ভোট হলেও তাদের জীবনে বেশি কিছু বদলায় না। তবু সেই মানুষের মাঝেই চলছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আলোচনা। কৃষি শ্রমিক আব্দুল খালেকের সঙ্গে কথোপকথনে ভোটের প্রসঙ্গ তুলতেই হালকা হাসি দিয়ে বলেন, ‘আমরা হলো গরিব মানুষ। গরিবের চিন্তা একটাই– আজ কী খাব, কাল কীভাবে চলব। ভোট তো বহুবার দিয়েছি। বুঝে গেছি, এই ভোট গরিবের জন্য না। 

ভোট হলো রাজনীতির বড়লোকদের খেলা। ভোট দিই বা না দিই, আমাগের জীবন তো একই থাকে।’ তাঁর কথার ভেতর লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, ক্লান্তি আর নিরাশার গল্প। আব্দুল খালেকদের সঙ্গে কথা শেষ করে ঠাকুরগাঁও শহর ঘুরে দেখার পালা। যেদিকেই চোখ যায় শহরের চেহারা বেশ মলিন মনে হয়। জেলা শহর বলে খুব একটা মনে হয় না। দিনাজপুর জেলার একটি মহকুমা হিসেবে শুরু হওয়া ঠাকুরগাঁও ১৯৮৪ সালে জেলায় উন্নীত হলেও এখনও যেন অবহেলিতই রয়ে গেছে।

পৌর এলাকার নিশ্চিন্তপুরে বৃহস্পতিবার কথা হয় এনজিওকর্মী মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, এই জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের জীবিকা কৃষি। কিন্তু প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষক ভূমিহীন। তারা আদতে কৃষক নন, কৃষি শ্রমিক। দিনমজুরি করে সোনার ফসল তুলে দেন বড় বড় গৃহস্থের গোলায়। এই ভূমিহীনদের উদয়াস্ত পরিশ্রমেই জেলায় উৎপাদিত হয় উদ্বৃত্ত খাদ্য। এ জেলায় শিল্প বলতে আছে ৩০টির মতো চালকল। অধিকাংশই হাসকিং মিল, চার-পাঁচটি অটোরাইস মিল, আর কিছু ইটভাটা। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত।

ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের কালীবাড়ি বাজার, বালিয়াডাঙ্গী ও রানীশংকৈল উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার ভোটারদের সঙ্গে কথা হয়। নির্বাচন সামনে রেখে তাদের কথায় উঠে আসে একটাই প্রত্যাশা– সৎ ও যোগ্য জনপ্রতিনিধি।

শহরের কলেজ পাড়ার বাসিন্দা মোজাক্কের হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন এলেই সব প্রার্থী এলাকার উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দেন; কিন্তু নির্বাচনের পর তাদের কোনো খবর থাকে না। তাই আমরা চাই নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হোক।’

ঠাকুরগাঁও সদরের বেগুনবাড়ি ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাফি আগাম আলু চাষ করেন। হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ভোট আসে, ভোট যায়; কিন্তু কৃষকের ভাগ্য বদলায় না। তবু চাই ভোটটা যেন শান্তিপূর্ণ হয়।’

ঠাকুরগাঁও সদরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গণসংযোগ। বুধবার তোলা সমকাল

এবার নির্বাচনে ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি আসনে ২০ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত আসন ঠাকুরগাঁও-১ (সদর)। ২২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ উপজেলা ঠাকুরগাঁও সদর। এখানে ভোটার চার লাখ ৮৭ হাজার ১৭৫। সংখ্যালঘু ভোটার এক লাখ ১৯ হাজার। নতুন ভোটার এক লাখ ৯২ হাজার ৫৬৭। অনেকে বলছেন সংখ্যালঘু, নতুন ভোটার ও ভাসমান ভোটাররা জয়-পরাজয়ের নিয়ামক।

এই আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা মো. দেলাওয়ার হোসেন। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দাপট থাকলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দলটির নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে জয় পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বিএনপি। জামায়াতে ইসলামীও সার্বিকভাবে চেষ্টা করছে।

মির্জা ফখরুল ১৯৯১ সাল থেকে এই আসনে বিএনপির হয়ে বিভিন্ন সময় নির্বাচন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেকবার কারাবরণ করা এই নেতা বয়সের বিষয়টি উল্লেখ করে এটিকে জীবনের শেষ নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করে ভোট চাচ্ছেন। তাঁর হয়ে ভোট চাইতে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন স্ত্রী রাহাত আরা বেগম, বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ, ছোট মেয়ে মির্জা শাফারুহ।

ঠাকুরগাঁওয়ের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের টান অনেক গভীর। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি আজও ‘প্রিয় স্যার’। এলাকার মানুষ তাঁর নাম বলেন ‘মির্জা আলমগীর’। একসময় শিক্ষকতা করতেন, তাই ছোট-বড় সবাই তাঁকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। স্থানীয় পরিচিতি ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থাকায় নির্বাচনী মাঠে তিনি আত্মবিশ্বাসী। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গণসংযোগ, উঠান বৈঠক ও পথসভায় অংশ নিচ্ছেন। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলছেন। 

তাঁর বিপরীতে জয় পেতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী। প্রথমবার নির্বাচনে আসা জামায়াতের প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য। পালন করছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারির দায়িত্ব। 

৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি, চাঁদাবাজি এবং ‘গণ-মামলার’ মতো বিষয়গুলোকে প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন এই প্রার্থী। 

পোড়খাওয়া রাজনীতিক মির্জা ফখরুলও বিমানবন্দর চালুর অঙ্গীকার করেছেন। আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলছেন, ‘এটাই আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক। তাদের সমস্যাগুলো কী, তা আমি জানি। আমাদের দল দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাগুলো পূরণ করতে পারব।’

 

আরও পড়ুন

×