রাজশাহী বিভাগের আসনগুলোতে যেসব উপজেলা ফল নির্ধারক হতে পারে
রাজশাহী বিভাগের উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন রুহুল কুদ্দুস তালুকদার, দবিবুর রহমান, ফারজানা শারমিন। ছবি: সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৬:১৫
কেবল একটি উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের আসনগুলোতে দলীয় প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হতে পারেন স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহীরা। দুই ও এর বেশি উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনের ক্ষেত্রে ব্যবধান গড়ে দিতে পারে চারটি বিষয়। এগুলো হলো– নারী ভোটার, নতুন ভোটার, প্রার্থীর নিজ এলাকার বাইরের উপজেলায় তাঁর ভোটব্যাংক ও দলীয় প্রভাব।
দেশের আট বিভাগের ১৬৭টি আসন থেকে সমকালের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কোন আসনে কোন বিষয়গুলো ফলাফল নির্ধারণে প্রভাবক হতে পারে, তা বের করার চেষ্টা করেছে সমকাল। এ নিয়ে বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন: ১০১ আসনে প্রভাব ফেলতে পারে ১১৬ উপজেলার ভোট
রাজশাহী বিভাগ: মোট আসন ৩৯ (তথ্য সংগ্রহ ৩০টির)
একাধিক উপজেলা বিশিষ্ট আসনগুলোর মধ্যে রাজশাহী-১-এ বিএনপি, জামায়াত, গণঅধিকার পরিষদ ও এবি পার্টির প্রার্থীরা গোদাগাড়ীর স্থানীয়। উপজেলাটির ভোটার ২ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৫ জন। অপরদিকে তানোরে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৫১ জন। ফলে প্রার্থীদের জিততে হলে তানোরের ভোট নিজের দিকে টানতে হবে। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি এমপি পেলেও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের কাছে আসন হারায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, বিএনপির প্রার্থীদের বিপরীতে জামায়াতের প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার ভোট পাওয়া বোঝায়, এ আসনে তাদেরও ভোট ব্যাংক আছে।
রাজশাহী-৩: ভোটারের সংখ্যা পবায় ২ লাখ ২৯ হাজার ৪৭৩টি। বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন বোয়ালিয়া থানার বাসিন্দা। অপরদিকে জামায়াত ও জাতীয় পার্টির দুজন প্রার্থী পবার স্থানীয়। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এ দুই দলের প্রার্থীরা যথাক্রমে ৩৩ হাজার ৮২৪ ও ৫৬ হাজার ৬৫২টি ভোট পেয়েছিলেন। আরেক উপজেলা মোহনপুরে স্থানীয় প্রার্থী কেবল ইসলামী আন্দোলনের ফজলুর রহমান। ২০০৮ সালে এ দলের প্রার্থীর ভোট ছিল ৪ হাজার ৬০টি। বর্তমানে মোহনপুরের ভোটার ১ লাখ ২৯ হাজার ১৯০ জন। ফলে মোহনপুরে ভোট যার দিকে বেশি যাবে তিনি এগিয়ে থাকবেন।
রাজশাহী-৫: প্রভাবক হতে পারে ১ লাখ ৪০ হাজার ৬০৪ জন ভোটারের দুর্গাপুর। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সবাই পুঠিয়ার স্থানীয়। এ উপজেলার ভোটার ১ লাখ ৬০ হাজার ২১৩। বিএনপির জন্য চাপ তাদের দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী। দলীয় নজরুল ইসলাম ও বিদ্রোহী ইসফা খায়রুল হক দুজনই পুঠিয়ার। ফলে তাদের মধ্যে ভোট কাটাকাটির সম্ভাবনা আছে। আরেক বিদ্রোহী রেজাউল করিম দুর্গাপুরের ভোটার হলেও তিনি লন্ডনে থেকেছেন। তাই বিএনপিসহ সব প্রার্থীর লক্ষ্য হতে পারে দুর্গাপুরের ভোট পাওয়া।
রাজশাহী-৬: মোট চারজন প্রার্থীর সবাই নিজ দলের জেলা শাখার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ১ লাখ ৪৪ হাজার ১১০ জনের বাঘা থেকে স্থানীয় প্রার্থী বেছে নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। অপরদিকে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির তিন প্রার্থী চারঘাটের। এখানকার ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ৯৬৮। ফলে বাঘার ভোটের দিকে তাদের নজর থাকতে পারে।
জয়পুরহাট-১: বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থীই সদরের স্থানীয়। যেখানে ভোটার ২ লাখ ৫২ হাজার ৪৬২। প্রধান দলগুলোর প্রার্থীদের জয়ের নির্ধারক হতে পারেন পাঁচবিবির ২ লাখ ৯ হাজার ৮০৫ ভোটার। জয়পুরহাট-২: আসনটি ৩ উপজেলা নিয়ে গঠিত। মোট তিন প্রার্থীর মধ্যে দুজন (বিএনপি ও এবি পার্টি) কালাইয়ের স্থানীয়। বাকি দুই উপজেলার মধ্যে আক্কেলপুরের ভোটার ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৯৫, যা কালাইয়ের চেয়ে মাত্র ২৯টি বেশি। ক্ষেতলালের ভোটার ৯৮ হাজার ১১ জন। জামায়াতের প্রার্থী আক্কেলপুরের স্থানীয়। প্রার্থীর আধিক্য বিবেচনায় ক্ষেতলাল ও আক্কেলপুর প্রভাবক হতে পারে।
নাটোর-১: প্রধান দল বিএনপি, জামায়াত ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীরা লালপুরের স্থানীয়। ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯১৭। অপরদিকে বাগাতিপাড়ায় ভোটার ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৫৯ জন। বিএনপির দলীয় প্রার্থী ও জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ফারজানা শারমিনকে চাপে ফেলতে পারেন বিদ্রোহী ও কেন্দ্রীয় কমিটির বহিষ্কৃত সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। তিনিও লালপুরের স্থানীয়। ফলে প্রার্থীদের ভোটযুদ্ধের ক্ষেত্র হতে পারে বাগাতিপাড়া।
নাটোর-২: আসনের মোট ৪ লাখ ৬ হাজার ৮৮৬ ভোটারের মধ্যে ১ লাখ ২১ হাজার ১৯৯ ভোটারের নলডাঙ্গা উপজেলা হতে পারে ‘ফ্যাক্টর’। বিএনপির দলীয় প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সদরের স্থানীয়। এ উপজেলায় তাঁর মতোই স্থানীয় প্রার্থী জামায়াতের জেলা আমির ইউনুস আলী ও জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক রকিব উদ্দিন। ১৯৯৬ সালে এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছিলেন ১৮ হাজার ১৬৯ ভোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে রুহুল কুদ্দুসের ভোট ছিল ১ লাখ ৯ হাজার ১৯৬টি। জামায়াত কিংবা অন্য দলের প্রার্থীরা সদরের স্থানীয় প্রার্থীর পরিচয় ও নতুন ভোটারের সুবিধা পেলে বিএনপিকে নলডাঙ্গার ভোটের দিকে তাকাতে হতে পারে। আবার সদরে রুহুল কুদ্দুসের ভোট ব্যাংককে টেক্কা দিতে হলে অন্য প্রার্থীদের নলডাঙ্গার ভোট টানতে হবে।
নাটোর-৪: ভোটার সংখ্যা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ বড়াইগ্রাম; ২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৪৪ জন। জামায়াত ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী এখানকার স্থানীয়। অপরদিকে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা গুরুদাসপুরের (১ লাখ ৯০ হাজার ২২৮)। এ উপজেলার চেয়ে বড়াইগ্রামের ভোট বেশি ৬৪ হাজার।
বগুড়া-১: বিএনপি ও জামায়াতের দুজন প্রার্থীর বাড়িই সারিয়াকান্দি। ফলে সোনাতলার ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৪৮টি ভোট গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হতে পারে নতুন ভোটার; ২০ হাজার ৮৬৪ জন।
বগুড়া-৩: বিএনপি ও জাপার প্রার্থী আদমদীঘির (ভোটার ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩০১) স্থানীয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জাপা এ আসনে দেড় লাখ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আগের নির্বাচনগুলোতেও তাদের প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছিলেন। বিএনপির হাতে আসনটি ছিল ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত। ভোট ব্যাংক বিবেচনায় এ দুই দলের প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। কিন্তু প্রার্থীরা একই উপজেলার হওয়ায় ‘ফ্যাক্টর’ হতে পারে আরেক উপজেলা দুপচাঁচিয়া।
বগুড়া-৪: জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা কাহালুর। বিএনপির নন্দীগ্রামের। জাপার প্রার্থী সদরের। ভোট সংখ্যা বিবেচনায় প্রভাবক হতে পারে কাহালু; ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪২৫টি। নন্দীগ্রামের ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ১০০ জন।
বগুড়া-৫: প্রভাবক হতে পারে ধুনট। বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা শেরপুরের। মোট ৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৪০ ভোটারের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৪২৪ জনই শেরপুরের। ২ লাখ ৬৩ হাজার ৯১৬ জন ধুনটের। তবে প্রধান দলগুলোর প্রার্থীদের কেউই এখানকার স্থানীয় নন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হতে পারে নতুন ভোটার। বগুড়ার ৭টি আসনের মধ্যে এখানেই নতুন ভোটার সবচেয়ে বেশি; ৩২ হাজার ৬৬১ জন।
বগুড়া-৭: জিয়া পরিবারের এলাকা হিসেবে পরিচিত গাবতলী। ফলে বিএনপির প্রার্থীর প্রতি এ উপজেলার ভোটারদের বিশেষ ঝোঁক থাকতে পারে। ভোটার সংখ্যাও (২ লাখ ৯২ হাজার ৩৯২) শাজাহানপুরের (২ লাখ ৪৫ হাজার ৭০০) তুলনায় বেশি। ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত এ আসনে জয়ী হয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
রাজশাহী বিভাগের অন্য আসনগুলোর মধ্যে পাবনা-২-এ সুজানগরের বিপরীতে প্রভাবক হতে পারে বেড়া উপজেলা। পাবনা-৩-এ চাটমোহর, ভাঙ্গুরা ও ফরিদপুরের মধ্যে প্রভাবক হতে পারে ফরিদপুর। বিএনপির দলীয় হাসান জাফিরের বিপক্ষে লড়বেন বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র কেএম আনোয়ারুল ইসলাম। হাসান জাফির পাবনা-২ আসনের বাসিন্দা। নির্বাচন করছেন ৩ নম্বর আসনে। আনোয়ারুল চাটমোহরের স্থানীয় ও সাবেক এমপি (২০০১)। জামায়াতের প্রার্থী ভাঙ্গুরার। ১৯৯৬ সালে প্রাপ্ত ১৪ হাজার ৯৩৬ ভোট ইঙ্গিত দেয়, এ আসনে জামায়াতের একটি ভোট ব্যাংক আছে। ফলে বিএনপি, বিদ্রোহী ও জামায়াতের প্রার্থীদের জন্য প্রভাবক হতে পারে ফরিদপুরের ১ লাখ ১০ হাজার ৪৫৩ ভোটার। পাবনা-৪ আসনে ঈশ্বরদীতে প্রার্থীদের আধিক্য বিবেচনায় প্রভাবক হতে পারে আটঘরিয়া।
এ ছাড়া প্রার্থীদের আধিক্য বিবেচনায় সিরাজগঞ্জ-১-এ কাজীপুরের বিপরীতে সদরের একাংশ, সিরাজগঞ্জ-২ এ সদরের আরেক অংশের বিপরীতে কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ-৩ এ রায়গঞ্জের বিপরীতে তাড়াশ এবং সিরাজগঞ্জ-৫ এ বেলকুচির বিপরীতে চৌহালী উপজেলার ভোটাররা প্রভাবক হতে পারে।
