রংপুর বিভাগে জামানত হারালেন ৯ নারী প্রার্থী
রংপুর অফিস
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৭:৩৮
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগে নারীর অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়লেও এখনও তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে। এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে ভোটযুদ্ধে থাকা ২৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮টি সংসদীয় আসনে ছিলেন ৯ নারী, যার ৪ জনই লড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। তবে ফলাফলে দেখা যায়, নারী প্রার্থীদের প্রাপ্ত সর্বোচ্চ ভোটের সংখ্যা ২৮৭৬ এবং সর্বনিম্ন ১৫৩। তারা প্রত্যেকেই জামানত হারিয়েছেন।
রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সূর্যমুখী প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছেন ৪৬১ ভোট। রংপুর-৪ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মাকর্সবাদীর প্রগতি বর্মণ তমা কাঁচি প্রতীকে পান ২৪৩ ভোট। রংপুর-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরী সূর্যমুখী প্রতীকে পেয়েছেন মাত্র ১৫৩ ভোট। ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নূরুন নাহার বেগম লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছেন ২ হাজার ৮৭৬ ভোট। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আশা মনি পান ২৭৯ ভোট। গাইবান্ধা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছালমা আক্তার কলস প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার প্রাপ্ত ভোট ৩৭৮। গাইবান্ধা-৫ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মার্কসবাদীর রাহেলা খাতুন কাঁচি প্রতীকে পান ২৪৯ ভোট। দিনাজপুর-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দুই নারী প্রার্থীর মধ্যে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের কিবরিয়া হোসেন মই প্রতীকে পেয়েছেন ২৮৩ ভোট এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগের লায়লা তুল রীমা হারিকেন প্রতীকে পেয়েছেন ২১৪ ভোট।
এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার আসনগুলোতে পুরুষের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকলেও ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াইয়ে ছিল না কোনো নারী। তবে তপশিল ঘোষণার আগে ও পরে এসব জেলায় অনেকই প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশসহ প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন।
একাধিক নারী প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলীয় মনোনয়ন পেতে গিয়ে তাদের সবচেয়ে বড় বাধা অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক প্রভাব। একইসঙ্গে মাঠে কাজ, জনপ্রিয়তা সব থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন বোর্ডে সিদ্ধান্ত হয় অন্যভাবে। সেখানে নারীদের নাম খুবই কম উঠে আসে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ এর তৃতীয় সংশোধনী অনুসারে, রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব পদে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী রাখার কথা বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে থাকা ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি বলেন, কোনো দলই নারীদের সেভাবে মুল্যায়ন করে না। সে কারণে কারো কারো পিছনে না ঘুরে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলাম।
রংপুর-৪ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মাকর্সবাদীর প্রার্থী প্রগতি বর্মণ তমা বলেন, দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলীয় ‘কাঁচি প্রতীক’ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিন বলেন, তৃণমূলের নারীদের ক্ষমতায়ন এবং রাজনৈতিক বিকাশে সব দলকে এগিয়ে আসতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি আন্দোলনের সম্মুখভাগে থাকা নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এখন আর নারীকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নয় বরং অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে যেতে সবার পাশে থাকা উচিত। দেখা গেছে, রংপুর অঞ্চলে যেসব নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন, তাদের একটি বড় অংশ স্বতন্ত্র বা ছোট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হয় মূলত ‘প্রতীকী আসনে’ বা এমন এলাকায়, যেখানে দলের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। ফলে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও নির্বাচিত হওয়ার হার এক শতাংশেরও কম। ভোটের মাঠে নারীদের এগিয়ে আনতে চাইলে শুধু উৎসাহ নয়, রাজনৈতিক দলের ভেতর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
