বনের হাতি সড়কে, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল
জঙ্গল ছেড়ে সড়কে বিচরণ করছে হাতি। সম্প্রতি শেরপুরের মধুটিলা ইকোপার্কের সীমান্ত সড়কে। ছবি: সমকাল
মিজানুর রহমান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)
প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৩:০৫ | আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৩:০৫
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর শেরপুরের গারো পাহাড়। নীল আকাশের নিচে লাল-সবুজের টিলার সমারোহ। পাহাড়ের বুকচিরে সীমান্ত সড়ক। সড়কের দুই পাশে সবুজ বন। প্রতিদিন হাজারো মানুষ যানবাহনে চলাফেরা করেন এই সড়কে। সড়কে আশপাশে শত শত বছর ধরে উপজাতি নৃ-গোষ্ঠীর নানা সম্প্রদায়ের বসবাস। এদের সংস্কৃতি ও জীবন-জীবিকা পাহাড়ের সৌন্দর্যকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। তবে এসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়, হঠাৎ লোকালয়ে ও সড়কে হানা দেয় বন্যহাতি।
শেরপুরের গারো পাহাড়ের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় এক সপ্তাহ ধরে লোকালয় চষে বেড়াচ্ছে ৩০-৩৫টি বন্য হাতির একটি দল। সীমান্তে জঙ্গল ছেড়ে খাবারের সন্ধানে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে উপজেলার কালাপানি ও মধুটিলা গ্রামে অবস্থান করছে হাতির পালটি। এ সড়কটি হাতি চলাচলের করিডোর। তাই সড়কে প্রায়শ নেমে পড়ে বন্যহাতির দল। কখনও কখনও হাতির দল যানবাহন ও মানুষকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। এতে প্রাণহানিসহ আহত-নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় যানবাহন ও ফসল। ফলে দিন দিন বাড়ছে মানুষ ও হাতির সংঘাত। বন্য হাতি দেখতে প্রতিদিন এ সড়কে উৎসুক জনতা ভিড় করছেন। তবে বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে বলা হচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্যমতে, ৩০টি হাতির একটি পালে ৪/৫টি শাবক আছে। এক সপ্তাহ ধরে হাতির পালটি কালাপানি ও মধুটিলা পাহাড়ি টিলায় অবস্থান করছে। পালটিকে কেউ যেন বিরক্ত করতে না পারেন, সে জন্য তারা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন।
বন বিভাগ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দেড় সপ্তাহ আগে সীমান্তের জঙ্গল ছেড়ে উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নের কালাপানি ও মধুটিলা জঙ্গলে চলে আসে হাতির পালটি। দিনের বেলা খাবারের জন্য বিভিন্ন টিলায় ঘোরাঘুরি করলেও শেষ বিকেলে হাতির পালটি লোকালয় ও সড়কে নেমে আসে। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে পথচারীদের। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় গ্রামবাসী মশাল জ্বালিয়ে হই-হুল্লোড় করে হাতির পালটিকে জঙ্গলে ফেরানোর চেষ্টা করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মধুটিলা ইকোপার্ক এলাকার সীমান্ত সড়কে ২৫ থেকে ৩০টি বন্য হাতি অবস্থান করছে। এতে প্রায় দুই-আড়াই ঘণ্টা ধরে সড়কে ছোট বড় যানবাহন ও মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের দুই পাশে গ্রামবাসী ও উৎসুক জনতা ভিড় করেছেন। হাতিগুলোকে তাড়াতে অথবা দেখতে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে ঢিল, কারও হাতে বাঁশি। সমস্বরে হইচই করছে কিন্তু হাতিগুলো ঠাঁই দাঁড়িয়ে। এলাকাবাসীর ধাওয়ায় এক পর্যায়ে হাতির দলটি সড়কের পূর্ব পাশে একটি টিলার দিকে চলে যায়।
স্থানীয় কয়েকজন যুবক বলেন, কিছু কিছু ব্যক্তি হাতি সড়কে পারাপারের সময় হাতিকে উত্ত্যক্ত করে ভিডিও ধারণ করেন। মানুষের আক্রমণাত্মক আচরণে দিনদিন হাতিগুলোও ক্ষিপ্ত হচ্ছে। মানুষ দেখলেই তেড়ে আসছে। তবে বনবিভাগের উচিত এগুলোতে নজর দেওয়া ও হাতি-মানুষকে নিরাপদে রাখা।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, আসলে হাতিগুলোকে এভাবে উত্ত্যক্ত করা ঠিক না। খাবারের জন্যই ওরা আসে। এভাবে হইচই করে ওদের বিরক্ত না করলে ওরা এভাবেই চলে যাবে। কিন্তু এ বিষয়ে সঠিক কোনো উদ্যোগ না নেওয়াতে দিন দিন উৎপাত বাড়ছেই।
পোড়াগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য হজরত আলী বলেন, এখন সীমান্তে বোরো ফসল রোপণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে হাতির পালটি মধুটিলা কালাপানি গ্রামের জঙ্গলে চলে এসেছে। প্রতিদিন খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ছুটোছুটি করছে। গ্রামের মানুষ হাতির আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন।
বন বিভাগের সমশ্চুরা বিট কর্মকর্তা মো. কাওসার হোসেন বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ২৫-৩০টি বন্য হাতি সমশ্চুরা, কালাপানি, বাতকুচি ও বুরুঙ্গা জঙ্গলে অবস্থান করছে। আমরা ইআরটি সদস্য ও এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে হাতির পালটিকে জঙ্গলে ফেরাতে কাজ করে যাচ্ছি। তবে হাতির কোনো ক্ষতি করা যাবে না বলে তিনি জানান।
- বিষয় :
- গারো পাহাড়
- শেরপুর
- হাতি
