এজলাস ভাগাভাগি, বসার জায়গা নেই ২৯ বিচারকের
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:২৪ | আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের দুটি অর্থঋণ আদালতে ৮০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণের বিচার চলছে। নিয়ম অনুযায়ী দুই বিচারকের জন্য আলাদা এজলাস ও খাস কামরা থাকার কথা। কিন্তু এ দুই আদালতের দুই বিচারক একটি খাস কামরায় বসছেন। ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছেন একটি এজলাস। সকালে অর্থঋণ আদালত-২ এর বিচারক এজলাসে উঠে বিচারিক কাজ শেষ করার পর দুপুরে একই এজলাসে ওঠেন অর্থঋণ আদালত-৩ এর বিচারক। কক্ষ সংকটের কারণে এজলাস ভাগাভাগি করে চলছে বিচারিক কাজ।
একই অবস্থা চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের ছয় যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালতে। ৬ যুগ্ম জজ এক এজলাস ও একই খাস কামরা ভাগাভাগি করে বিচারিক কাজ করছেন। সকালে এজলাসে একজন যুগ্ম জজ উঠলে অন্যজন বসে থাকেন খাস কামরায়। তিনি এজলাস থেকে নামার পর অন্য যুগ্ম জজ দুপুরের পর একই এজলাসে ওঠেন। এভাবে গত ছয়-সাত মাস একটি এজলাস ও খাস কামরা ভাগাভাগি করে দুই জজকে বিচারিক কাজ করতে হচ্ছে। কারণ চট্টগ্রামে নতুন ২৯ বিচারকের পদ সৃষ্টি করে বিচারক পদায়ন করলেও তাদের বসার কক্ষ এবং বিচারিক কাজ করার পর্যাপ্ত এজলাস নেই। সংকট রয়েছে খাস কামরারও। শিগগিরই অবকাঠামোগত সংকট থেকে নিস্তার পাওয়ার সুযোগ নেই বলে আদালত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির জিএএম শহীদুল ইসলাম বলেন, জেলা জজ পদমর্যাদা, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজসহ ২৬টি নতুন আদালত এবং বিচারকের পদ সৃষ্টি করে সরকার। অধিকাংশ পদে বিচারকও নিয়োগ দেওয়া হয়। কক্ষ সংকটের কারণে একটি খাস কামরা ও এজলাস দুজন বিচারককে ভাগাভাগি করে কাজ করতে হচ্ছে। এজলাস ও কক্ষ সংকট কীভাবে নিরসন করা যায়, এর উপায় খুঁজছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. নেছার আহম্মদ বলেন, মহানগর জজশিপে ১৫ বিচারকের এজলাস ও বসার খাস কামরা রয়েছে। এখন ১৯ জন জজ হওয়ায় চার জনের খাস কামরা ও এজলাস সংকট রয়েছে। নেজারতখানা ও লাইব্রেরি ভেঙে একটি এজলাস ও খাস কামরা তৈরি করা হলেও সংকটের সমাধান করা যাচ্ছে না।
আইনজীবী জাফর ইকবাল বলেন, বিচারিক কাজে গতি আনতে সরকার নতুন বিচারক নিয়োগ দিয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ। জেলা প্রশাসন ভবনের সামনে টিনশেড বেশ কয়েকটি পুরোনো বিচারিক স্থাপনা খালি পড়ে আছে। সেই টিনশেড স্থাপনাগুলো অস্থায়ী ভিত্তিতে বিচারিক কাজে ব্যবহার করলে সমস্যা কিছুটা লাঘব হবে।
আদালত সূত্র জানায়, নতুন চারটি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ পদ সৃষ্টি হওয়ায় বর্তমানে ১১টি অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারিক কাজ চলছে। সব মিলিয়ে এখন মহানগর দায়রা জজ আদালতে ১৯ জন জজ রয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ জজের বসার খাস কামরা ও এজলাস রয়েছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া চারজন অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজের অফিস সংকট রয়েছে। এটি নিরসনে সাতজন যুগ্ম মহানগর জজ তিনটি এজলাস ও খাস কামরা ভাগাভাগি করছেন। ৯ জন অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আলাদা এজলাস ব্যবহার করলেও দুইজন অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজকে একটি এজলাস ও খাস খামরা ভাগাভাগি করতে হচ্ছে।
একই অবস্থা চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। এখানে ১০টি আদালত থাকলেও নতুন ১০টি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত সৃষ্টি করা হয়। একই সঙ্গে ১৩টি পারিবারিক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ, একজন ল্যান্ড আপিল ট্রাইব্যুনালের জেলা জজ পদমর্যাদা, একটি জেলা শিশু ধর্ষণ জজ এবং একটি পারিবারিক আপিল জজ আদালতসহ ২৬টি নতুন আদালত সৃষ্টি করে সরকার। তবে বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজসহ ১১টি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ১১ জনের বসার খাস কামরা ও এজলাস রয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে একজন অতিরিক্ত জেলা জজের খাস কামরা ও এজলাস এখন দুজন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজকে ভাগাভাগি করে বিচার কাজ করছেন।
যদিও জেলা জজ আদালত ভবনের ছাদে তিন বিচারক বসার জন্য খাস কামরা ও এজলাস তৈরির ব্যাপারে সরকার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে, তবে এখনও অর্থ বরাদ্দ মেলেনি। এ ছাড়া সাময়িক বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ভবনের সামনে পুরোনো টিনশেড তিনটি ভবনকে বিচারিক কাজে ব্যবহারের আলোচনা চলছে। যদিও একসময় সেখানে চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারিক কাজ চলত। পরে নতুন ভবন হওয়ায় সেখানে জুডিশিয়াল আদালত স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকে তিনটি স্থাপনা জেলা প্রশাসনের আওতায় পুলিশ ব্যবহার করে আসছে।
গত সোমবার জেলা দায়রা জজ আদালত ভবনের বারান্দায় মিরসরাই থেকে আসা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, খুনের মামলার হাজিরা দিতে ভোরে মিরসরাই থেকে এসেছি। পেশকার জানিয়েছেন, আমার মামলার শুনানি দুপুরের পর হবে। সকালে অন্য এক বিচারক বসবেন। তিনি নামার পর আমার মামলার শুনানি করতে আরেকজন বিচারক এজলাসে উঠবেন। সারাদিন আদালতের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করেই সময় পার করতে হচ্ছে।
- বিষয় :
- এজলাস
