স্বর বদলে হারিয়ে যাচ্ছে আদিবাসীদের ভাষা
বন থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরছেন নালিতাবাড়ী উপজেলার খলচান্দা গ্রামের কোচ সম্প্রদায়ের নারীরা সমকাল
মিজানুর রহমান, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা। উঠানে ছোট্ট কুটির। সেখানে বসে কাজ করছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব কৃষক। কুশল বিনিময় শেষে নিজের কোচ ভাষায় একটু কথা বলতে তাঁকে অনুরোধ করা হয়। এতে দু-একটি বাক্য শুরু হতেই শব্দের ফাঁকে ফাঁকে বাংলাজুড়ে দিয়ে কথা বলতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর বাক্যগুলো আর কোচ ভাষাতে রইল না, রূপ নিল পুরোপুরি বাংলায়। কথা শেষে আক্ষেপ করে বললেন, এটিই এখন তাদের ভাষার অবস্থা। কথোপকথনটি হয়েছে নালিতাবাড়ী উপজেলার কোচ অধ্যুষিত খলচান্দা গ্রামের রমেশ কোচের সঙ্গে। তাদের নিজস্ব ভাষা আছে, কিন্তু ধীরে ধীরে সেসবের স্বর বদলে যাচ্ছে।
রমেশ কোচ জানান, তাঁর মেয়ে কলেজে পড়েন। তিনি নিজে কোচ ভাষা জানলেও মেয়ে ঠিকমতো কোচ ভাষা বলতে ও লিখতে পারেন না। তাঁর ভাষ্য, কোচ ভাষার বর্ণমালা, বই ও শিক্ষক না থাকায় ছেলে-মেয়েরা নিজেদের ভাষার চর্চা করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
শেরপুরের গারো পাহাড়ের সীমান্তজুড়ে গারো, কোচ, হাজং, বানাই, বর্মণ, হদি, ডালুসহ সাতটি নৃগোষ্ঠীর ৬০ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা। এসব পরিবারের সুখ-দুঃখের গল্পটা চলে মাতৃভাষাতেই। কিন্তু ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে হাঁটতে হয় বাংলা ভাষার পথ ধরে।
গারো ও কোচ ভাষা কোনোমতে টিকে থাকলেও অন্য ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নিজস্ব বর্ণপরিচয়, চর্চা ও পড়াশোনার সুযোগ না থাকায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন আদিবাসীরা। ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় সংস্কৃতি কেন্দ্র, পাঠ্যবই এবং শিক্ষক দরকার বলে দাবি তাদের।
গতকাল শনিবার বিকেলে খলচান্দা কোচপল্লি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পরিমল কোচ, রঞ্জিত কোচ ও পরমেশ্বর কোচসহ কয়েকজন বাড়ির পাশে গাছের ছায়ায় বসে খোশগল্প করছেন। তারা নিজেদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বাংলাতে কথা বলছেন।
তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এক সময় সমৃদ্ধ ভাষা ও সংস্কৃতি থাকলেও চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ভুলতে বসেছেন নিজস্ব মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি। তাদের একটি অংশ শিক্ষিত হচ্ছে আধুনিক শিক্ষায়, আর অল্প কিছু স্কুলে আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষা ধরে রাখার চেষ্টা করা হলেও শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। তাই তাদের ভাষা ধরে রাখতে প্রতিটি স্কুলে বইয়ের পাশাপাশি আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ ও একটি সাংস্কৃতিক একাডেমি স্থাপনের দাবি তাদের।
সম্প্রতি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস খলচান্দা গ্রামে একটি ‘মাল্টিলিঙ্গুয়াল প্রি-প্রাইমারি স্কুল’ চালু করেছে। সেখানে শিশুদের মাতৃভাষা শেখানো হয়।
কাটাবাড়ী এলাকার সিসিলিয়া কুবি নামে এক শিক্ষার্থী জানান, আগের লোকজন গারো ভাষায় কথা বলতে পারলেও এখন তারা পারে না। কারণ স্কুলে বাংলা ভাষা শিখে বড় হয়েছেন। তাদের চাওয়া সরকার স্কুলগুলোতে তাদের নিজস্ব ভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করুক।
বারমারী এলাকার বাসিন্দা ফ্রান্সিস বলেন, ‘আমরা চাই প্রাথমিকে প্রতিটি স্কুলে আমাদের নিজস্ব ভাষার পাঠ্যবই, পাশাপাশি আমাদের ভাষার শিক্ষকও। এ ছাড়া একটি কালচারাল একাডেমি হলে সংস্কৃতি চর্চা করা সম্ভব হবে। যদি এসব না হয়, তাহলে ভাষা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।’
নালিতাবাড়ী উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান কোপেন্দ্র নকরেক বলেন, মাতৃভাষা ধরে রাখার জন্য আমরা নিজেরা বাড়িতে সব সময় আচিক ভাষায় কথা বলি। তবু আমাদের ভাষা রক্ষা করা যাচ্ছে না। বাংলার সঙ্গে ক্রমেই মিশে যাচ্ছে। গারো শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
শেরপুর জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমানের ভাষ্য, আদিবাসীদের সমৃদ্ধি সংস্কৃতি রক্ষা ও চর্চার জন্য ইতোমধ্যে একটি কালচারাল একাডেমির করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি সরকারের পর্যালোচনার মধ্যে আছে।
- বিষয় :
- ভাষা
