তৃণমূল কর্মীদের বেপরোয়া আচরণেই হার বিএনপির
ফারুক হোসেন, মেহেরপুর
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মেহেরপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে বাড়ি গৃহিণী আলেয়া খাতুনের। ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বাড়ি সোহাগী খাতুনের। তিনি পেশায় গৃহকর্মী। এই দুই নারীই একটি বিষয়ে একমত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারা বিএনপি কর্মীদের কাছে হুমকি পেয়েছেন। তারা বলেন, বিএনপি কর্মীরা ভয়ভীতি দেখিয়েছেন, ধানের শীষের ভোট না দিলে সমস্যা হবে। ক্ষমতায় না গিয়েই তাদের খারাপ আচরণের কারণে নারীরা জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লায় বেশি ভোট দিয়েছেন বলে মনে করেন এই দুই নারী।
জেলার দুটি সংসদীয় আসনেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। অথচ জেলাটি এতদিন বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবেই মনে করতেন নেতাকর্মীরা। আর স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন ভোটাররা মনে করেছেন, ফলের পর তাদের সামাজিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তখন তারা অধিকতর কম ঝুঁকির বিকল্প হিসেবে জামায়াতকে বেছে নিয়েছেন। বিএনপির জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা তৃণমূলকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্তর্কলহ, কমিটি নিয়ে বাণিজ্য, ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়নের মতো দীর্ঘদিনের ক্ষোভ নির্বাচনে বিস্ফোরিত হয়েছে বলেও মনে করছেন তারা।
সদর ও মুজিবনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত মেহেরপুর-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী ও সাবেক এমপি মাসুদ অরুণ এবার পেয়েছেন এক লাখ চার হাজার ২২৪ ভোট। এখানে বিজয়ী জামায়াতের প্রার্থী মো. তাজউদ্দীন খান পেয়েছেন এক লাখ ২২ হাজার ৮২৯ ভোট। অথচ এই আসনে ২০০১ সালে মাসুদ অরুণ প্রায় এক লাখ দুই হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হয়ে সংসদে যান। ২০০৮ সালে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাজউদ্দীন খান পেয়েছিলেন ৩৪ হাজার ভোট।
এ আসনে ১৯৮৬, ১৯৯১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে জিতেছেন বিএনপি প্রার্থীরা। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মাসুদ অরুনের হার বিষয়ে শিক্ষার্থী হাসনাত জামান সৈকত বলেন, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অতি বাড়াবাড়ি করেছেন। এ ছাড়াও দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্রমাগত ভোটারদের হুমকিধমকির কারণে তরুণ ও নারী ভোটাররা জামায়াতে ভোট দিয়েছেন। ভোটাররা কেবল প্রার্থী নয়, প্রার্থীর আচরণ, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতির ওপর রায় দিয়েছেন বলেও মনে করেন তিনি।
এই আসনে জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচনী প্রধান এজেন্ট সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ মুকুলের ভাষ্য, বিএনপির কর্মীরা এখানে জামায়াতের নারীদের প্রচারে যত বেশি বাধা দিয়েছে, তত বেশি ভোট বেড়েছে জামায়াতের। বিশেষ করে নারী ভোটাররা সহিংসতা-সংঘাত চান না, তারা চান শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। প্রচারে নারীদের বাধা দেওয়ায় নারী ভোট তারা বেশি পেয়েছেন। তাছাড়া তরুণ ভোটররা জামায়াতের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জুলাইর চেতনা ধারণ করেও দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন।
এই মন্তব্য অস্বীকার করের বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট আনারুল ইসলাম কালু। তাঁর ভাষ্য, জামায়াতের নারী কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় ধর্মের দোহাই দিয়ে ভোট চেয়েছেন। কেউ কথা বললেই প্রচারে বাধার ধোঁয়া তুলে নির্বাচনী ফায়দা তুলেছে। বিএনপি হেরেছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে। বিএনপির ভোটাররাই দলকে ভোট না দেওয়ায় এই পরাজয়।
বিএনপির প্রার্থী মাসুদ অরুণ বলেন, ‘১৭ বছর ধরে দলের হাল ধরে ছিলাম। ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট জেলা বিএনপির কাউন্সিলে কমিটি থেকে আমাকে বাদ দেওয়া হয়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আস্থা রেখে মনোনয়ন দিয়েছিলেন।’ এতে ঈর্ষান্বিত হয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতারা পরিকল্পিত উপায়ে তাঁকে হারিয়েছে, জেলা কমিটির ওই নেতারাই এখন নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বিজয়ী সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মো. তাজউদ্দীন খান বলেন, ৫ আগস্টের পর বিএনপির কিছু তৃণমূল নেতা হাটবাজার, খাল-বিলসহ নানা সামাজিক সংগঠনের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জামায়াত হেঁটেছে ভিন্ন পথে। সংগঠনকে মজবুত করতে ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি গঠন, ভোটারের সঙ্গে সার্থক যোগাযোগ, অসুস্থ-অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, চিকিৎসা-সহায়তা ও শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করেছেন তারা। এ ছাড়া ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে তারা ভোটারের আস্থা অর্জন করেছেন। তাই তারা জামায়াতকে ভোট দিয়েছেন।
বিভক্তির পরিণতি পরাজয়ে
গাংনী উপজেলা নিয়ে গঠিত মেহেরপুর-২ আসনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে এতদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ ছিল। আওয়ামী লীগ এ আসনে ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে জয়ী হয়েছে। বিএনপি জিতেছে ১৯৯১, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে। জামায়াতে ইসলামী ছিল তৃতীয় শক্তি। এবার সেই জামায়াতের প্রার্থী মো. নাজমুল হুদা এবার ৯৪ হাজার ১৬৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মো. আমজাদ হোসেন পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৬৮৯ ভোট। অথচ তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে প্রায় তিন হাজার ভোটে পরাজিত করেছিলেন।
এখানে হারের পেছনে মূল কারণ দলীয় কোন্দল। সাবেক এমপি আমজাদ হোসেনকে বাদ দিয়ে জেলা কমিটির সভাপতি করা হয় জাভেদ মাসুদ মিল্টনকে। সেই থেকে এই আসনের বিএনপির ভোটাররা বিভক্ত। দ্বিধাবিভক্ত বিএনপি কর্মসূচি আলাদাভাবে পালন করে আসছিল।
আমজাদ হোসেন এবার বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর দলীয় শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। প্রার্থী বদলের দাবিতে লাগাতার বিক্ষোভ হয়েছে। হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষও। এসব ঘটনার পাশাপাশি বিএনপি কর্মীদের ঔদ্ধত্যমূলক আচরণেই এখানে দলটির প্রার্থী হেরেছেন।
গাংনীর গোয়ালগ্রাম গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল ও মো. নাজিম উদ্দিনের ভাষ্য, ৫ আগস্টের পর বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করেছিল, তারা ক্ষমতায় চলে গেছে। আচরণ খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সাধারণ ভোটাররা শান্তি চায়। হামলা-মামলা থেকে বাঁচতে, শান্তি পেতেই মানুষ দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছে।
গাড়াবাড়িয়ার রিপন হোসেন মনে করেন, নির্বাচনী প্রচারে জামায়াতের বাধা দেওয়া সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এ ছাড়া ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়েছেন বিএনপি কর্মীরা। এসব কারণে মানুষ জামায়াতে ভোট দিয়েছে।
গাংনীর বিএনপি সমর্থক মনিরুল ইসলামের ভাষ্য, ভোটের প্রচারে মিল্টন সমর্থকরা ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কথা বললেও আড়ালে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে বলেছেন। ফলে বিএনপির অর্ধেক ভোট পাল্লায় চলে গেছে। বিএনপি প্রার্থীকে পরিকল্পিত উপায়ে হারানো হয়েছে।
এখানে জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট মাহাবুবুর রহমান বলেন, জামায়াত ভোটারদের কাছাকাছি ছিল। বিপদে সহায়তা করেছে। ন্যায় ও ইনসাফের সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখায় নারী ও তরুণ ভোটাররা তাদের ভোট দিয়েছে।
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর জেলা বিএনপির সভাপতি মিল্টন ধানের শীষে ভোট চাইলেও বিভাজনের কারণে ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেন– এমন ভাষ্য বিএনপি প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আসাদুজ্জামান বাবলুর। তিনি বলেন, ‘দলের নেতাদের গাদ্দারির কারণে আমরা হেরেছি। ২০০৮ সালে খুলনা বিভাগে বিএনপি মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল। এর একটি আমজাদ হোসেন। গাংনীর মাটি বিএনপির ঘাঁটি। দলীয় নেতাদের প্রতারণাই বিএনপির হারের কারণ।’ মিল্টনের লোকজন সব জামায়াতে ভোট দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এসব অস্বীকার করে জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টন বলেন, উপজেলা বিএনপির সব কমিটির নেতাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে আমজাদ হোসেন আওয়ামী লীগের লোকদের প্রাধান্য দিয়েছেন। এভাবে নির্বাচন পরিচালনা করায় বিএনপি হেরেছে। তিনি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা বিএনপির কমিটির কোনো নেতাকেই সঙ্গে নেননি। হারের দায় তাই বিএনপি নেতাকর্মীরা নিতে পারেন না।
জামায়াতে ইসলামীকে আদর্শিক দল উল্লেখ করে দলটির বিজয়ী প্রার্থী মো. নাজমুল হুদা বলেন, ভোটাররা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হামলা-মামলা পছন্দ করে না। সততা ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে তারা জামায়াতকে ভোট দিয়েছে। হুমকিধমকি নয়, ভালোবেসেই ভোট দিয়েছে।
- বিষয় :
- তৃণমূল
