ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শরীয়তপুরে ইটভাটায় শিশুশ্রম

স্কুল ছেড়ে কঠিন জীবন সংগ্রামে সায়মা-ইমনরা

স্কুল ছেড়ে কঠিন জীবন  সংগ্রামে সায়মা-ইমনরা
×

ইটভাটায় বাবা-মায়ের সঙ্গে সায়মা আক্তার (বাঁয়ে) , ইটভাটায় শিশু ইমন (ডানে) সমকাল

বিপ্লব হাসান হৃদয়, শরীয়তপুর

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শরীয়তপুর জেলার জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটায় কাজ করছে প্রচুর শিশুশ্রমিক। পরিবারে অভাব-অনটনের কারণে এসব শিশু লেখাপড়া ও খেলাধুলা করার বয়সে শারীরিক কষ্টসাধ্য কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। অল্প বয়সেই কঠিন জীবন সংগ্রামে নামতে হয়েছে তাদের।

শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার মূলনা ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি এলাকায় অবস্থিত ভূঁইয়া ব্রিকস ফিল্ডে কাজ করছিল ১৩ বছর বয়সী সায়মা আক্তার। সায়মা পরিবারের বড় সন্তান। তার বাবা শাহ আলম ও মা সাহিদা বেগম দুজনই দিনমজুর। সংসারের দৈনন্দিন খরচ এবং অভিভাবকদের ঋণ মেটানোর জন্য সায়মাকে স্কুল ছাড়তে হয়েছে।
সায়মা বলে, ‘আমি পড়াশোনা করে বড় হতে চাইতাম। ইচ্ছা ছিল শিক্ষিত হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার; কিন্তু সেই সুযোগ কোথায়?’

ভাটায় সায়মার কাজের ধরনও খুবই কঠিন। কখনও কাঁচা মাটি বহন, কখনও রোদে ইট শুকানো, আবার কখনও ভেজা ইট উল্টানোর কাজ করতে হয়। প্রতিদিনের শ্রমের বিনিময়ে সে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পায়। মাঝে মাঝে ৪০০ টাকা পর্যন্ত আয় করে সে।
সায়মার বাবা শাহ আলম বলেন, ‘মেয়ে আমার সঙ্গে কাজ করে কিছু টাকা পায়। ঋণ থাকায় পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন। চারজনের সংসার, কোনো রকমে খেয়ে-পরে বেঁচে আছি। মেয়েকে স্কুলে পাঠানো এখন অসম্ভব।’

একই চিত্র নড়িয়া উপজেলার মুক্তারেরচর ইউনিয়নের মৃধাকান্দি এলাকার মক্কা ব্রিকস ফিল্ডে। সেখানে ১২ বছর বয়সী ইমন ও ১৪ বছর বয়সী সাগরকে ভাটায় কাজ করতে দেখা গেছে।
পিতৃহীন ইমন সাতক্ষীরা থেকে মামার সঙ্গে এসে প্রায় আট মাস ধরে ইটভাটায় কাজ করছে। ইট উল্টানো এবং সাজানোর কাজের বিনিময়ে প্রতি এক হাজার ইটে ৪০০ টাকা পায় সে।
পড়াশোনার প্রসঙ্গে ইমন জানায়, ‘পড়তে মন চায়, কিন্তু কোথা থেকে সময় বা সুযোগ পাব?’

অপরদিকে ১৪ বছর বয়সী সাগর তাঁর বড় ভাইয়ের সঙ্গে ইটভাটায় কাজ করতে এসেছে। সে বলে, ‘কাজ করে যা পাই, তা দিয়ে নিজের খরচ চালাই। চার মাস পর পর বাড়ি গেলে বাবা-মায়ের জন্য কিছু টাকা নিয়ে যাই। পড়াশোনার সুযোগ এখন আমার কাছে দিবাস্বপ্নের মতো।’
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ ১৪ বছর বা তার নিচের বয়সী শিশুদের দিয়ে কাজ করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও ইটভাটায় শিশু শ্রমিকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
জাজিরার ভূঁইয়া ব্রিকস ফিল্ডের ম্যানেজার মিজানুর রহমান জানান, তাদের ভাটায় কোনো শিশুশ্রমিক নেই। তারা শিশুশ্রমিক দিয়ে কাজ করান না। একই সুর নড়িয়ার মক্কা ব্রিকস ফিল্ডের ম্যানেজার আতাউর রহমানেরও। তিনি দাবি করেন, তারা কোনো শিশুশ্রমিক নিয়োগ দেন না। তবে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেউ ভাটায় কাজ করলে সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। এ বিষয়ে ভাটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের কোনো চুক্তি নেই।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার জয়নগর এলাকায় অবস্থিত ‘কে কে ব্রিকস ফিল্ড’ নামক ইটভাটায় অন্তত তিন শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত। সেখানে তারা কাঁচা ইট বহন, মাটি কাটাসহ ইট তৈরির প্রস্তুতিমূলক কাজে ব্যস্ত ছিল। ভাটার ধুলাবালি ও উচ্চ তাপের মধ্যেই দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে দেখা যায় তাদের। ভাটায় কর্মরত অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাজ করা এসব শিশুর কারও বয়সই ১৪ বছরের বেশি নয়।

এ ছাড়া গোসাইরহাট উপজেলার ‘হাটুরিয়া ব্রিকস ফিল্ড’ এ আরও দুই শিশুকে কাজ করতে দেখা গেছে। তারাও ইট বহন ও ভাটার সহায়ক কাজে যুক্ত রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরিবারের আর্থিক সংকট ও অভাব-অনটনের কারণেই তারা স্কুল ছেড়ে শ্রমে নেমেছে।
শরীয়তপুর জেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি জলিল খান বলেন, জেলায় কোনো ইটভাটায় শিশুশ্রমিক কাজ করছে এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। শিশুশ্রমের বিষয়ে সমিতি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অতীতেও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ইটভাটা মালিকদের কেউই কোনো শিশুশ্রমিকের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিবদ্ধ নন। তবে কোনো শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাটায় কাজ করলে সে 
বিষয়ে সমিতি অবগত নয়। শিশুশ্রম বন্ধে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করার কথাও জানান তিনি।
এ বিষয়ে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহমিনা বেগম বলেন, শিশুশ্রমের অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিশুশ্রম প্রতিরোধে প্রশাসন কঠোর। এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ 
আদালত পরিচালনা এবং নিয়মিত তদারকি অব্যাহত আছে। 
 

আরও পড়ুন

×