দশ বছর ধরে অচল ক্যাথল্যাব, ঢাকামুখী ফরিদপুরবাসী
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদরোগীদের চিকিৎসায় ২০১৬ সালে স্থাপন করা হয় অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাব। সংবাদ প্রকাশের জেরে বছর দুয়েক আগে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেখা যায় যন্ত্রটি পড়ে থেকেই অকেজো হয়ে গেছে। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগের কথা শোনালেও চালু হয়নি আট কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত ক্যাথল্যাবটি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেরামত করে দেওয়ার কথা জানালেও চিঠি লেনদেন পর্যন্তই কার্যক্রম থমকে গেছে।
এদিকে, হৃদরোগ পরীক্ষার অত্যাধুনিক যন্ত্রটি চালু না হওয়ায় স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ। জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য রোগীদের ঢাকাসহ বড় শহরে ছুটতে হচ্ছে। এতে একদিকে নষ্ট হচ্ছে সময় অন্যদিকে খরচের সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকিও। ক্যাথল্যাবটি চালু থাকলে এখানে এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি (রিং পরানো) সহ হৃদরোগের চিকিৎসা কম খরচে দেওয়া সম্ভব হতো।
রাজধানীমুখী রোগীর ঢল, বাড়ছে ঝুঁকি
বর্তমানে ফরিদপুরে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর ক্যাথল্যাব নেই। ফলে জরুরি অবস্থায় রোগীদের ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরে ছুটতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।
চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত এনজিওগ্রাম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে।
বেসরকারি নির্ভরতায় অসহায় নিম্ন আয়ের মানুষ
ফরিদপুরে বর্তমানে একটি বেসরকারি
হাসপাতালে ক্যাথল্যাব সেবা থাকলেও সেখানে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর পক্ষে সেই সেবা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা
আব্দুল করিম (৫৬) বলেন, ‘আমার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ার পর ডাক্তার এনজিওগ্রাম করতে বলেছেন। এখানে ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকায় যেতে হয়েছে। যাতায়াত, পরীক্ষা আর চিকিৎসা মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গরিব মানুষের জন্য এটা খুব কষ্টকর।’
আরেক রোগীর স্বজন সাজেদা বেগম বলেন, ‘হঠাৎ বুকে ব্যথা উঠলে আমার বড় বোনকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু এখানে উন্নত কোনো ব্যবস্থা নেই। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়েছে।’
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সভাপতি আওলাদ হোসেন বাবর বলেন, ‘এটি শুধু একটি মেশিন নয়, এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এটি অচল থাকা মানে মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাখা।’
যে কারণে বন্ধ ক্যাথল্যাব
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যাথল্যাব চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল যেমন ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান থাকলেও মূল সমস্যা হচ্ছে যন্ত্রপাতি সচল না থাকা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মেশিনটি অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. আজমল হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজনীয় ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান রয়েছে। কিন্তু ক্যাথল্যাবের মেশিনটি দীর্ঘদিন চালু না
থাকায় অনেকটা অকেজো হয়ে গেছে। মেশিনটি ঠিক করা গেলে আমরা খুব দ্রুতই সেবা চালু করতে পারব।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. হুমায়ূন কবির বলেন, ‘ক্যাথল্যাবটি দীর্ঘদিন অচল রয়েছে। আমরা এটি সচল করার জন্য নিমিউকে (ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইক্যুপমেন্ট মেইনটেইন্যান্স ওয়ার্কশপ) চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা জানিয়েছে, মেশিনটি ভালো নেই এবং তারা কাজ করতে পারবে না। তারা পরামর্শ দিয়েছে, যেখান থেকে মেশিনটি কেনা হয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ফিলিপস কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তবে এখন পর্যন্ত তারা কার্যকর কোনো সমাধান দেয়নি।’
এ বিষয়ে ফিলিপস কোম্পানির প্রতিনিধি মো. রফিক বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করলে আমরা মেশিন সারাতে গত ডিসেম্বরে চাহিদাপত্র দিয়েছি। পরবর্তীতে আমাদের সঙ্গে আর কেউ যোগাযোগ করেনি।’
ফরিদপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সুলতান মাহমুদ বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত ক্যাথল্যাবটি সচল করা জরুরি। এটি চালু হলে শুধু ফরিদপুর নয়, আশপাশের জেলাগুলোর মানুষও উপকৃত হবে। এতে কম খরচে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত হবে এবং অনেক হৃদরোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।
- বিষয় :
- ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
