আড়তে পেঁয়াজ এনেও বিক্রি করতে না পেরে হতাশ কৃষক
গোয়ালন্দ বাজারে পেঁয়াজের কেনাবেচা
আজু শিকদার, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ | ০৯:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ষাটোর্ধ্ব মো. সেকেন আলী সেক ২০ মণ পেঁয়াজ নিয়ে মঙ্গলবার এসেছিলেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ বাজারে। এই জেলাটি পেঁয়াজ উৎপাদনে সারাদেশে তৃতীয় স্থানে আছে। ব্যাংক ঋণ নিয়ে আবাদ করা সেকেন আলী বাজারে এসে পড়েন বিপাকে। তাঁর পেঁয়াজ কেনার মতো খদ্দের নেই। এমনকি ঠিকমতো দামও জিজ্ঞাসা করছিলেন না কেউ। এতে হতাশায় ভেঙে পড়েন এই কৃষক।
কয়েক বছর ধরেই পেঁয়াজ চাষ করে লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানান উজানচর ইউনিয়নের মাখন রায়ের পাড়া গ্রামের বাসিন্দা সেকেন আলী। চলতি মৌসুমে তিনি পেঁয়াজের আবাদ করেছেন ১৬ বিঘা জমিতে। প্রতি বিঘায় তাঁর খরচ হয়েছে ৭০-৮০ হাজার টাকা। অথচ প্রতি বিঘায় উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি করে এই চাষির হাতে আসছে ২৫-৩০ হাজার টাকা। বিপুল অঙ্কের টাকা লোকসান হওয়ায় সারাবছরের খোরাকি ও ব্যাংকঋণের কিস্তি শোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
সেকেন আলী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘এবার একেবারে পথে বসে গেছি। পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে আসলে চোখের পানি ফেলে বাড়ি ফিরতে হয়। লজ্জা থাকলে আগামীতে আর পেঁয়াজের আবাদ করব না।’
তাঁর মতো বেশির ভাগ পেঁয়াজ চাষির মনে একই হতাশা। তারা বলছেন, প্রতি বছর পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। বর্তমানে বাজারে যে দাম মিলছে, এতে উৎপাদন খরচের অর্ধেকও উঠছে না।
রাজবাড়ী কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে জেলায় মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ টন। বাম্পার ফলন হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৭২০ টাকা থেকে ১ হাজার ৯২০ টাকা। অথচ গত এক সপ্তাহ পেঁয়াজের বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, প্রতি মণ মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০০-১২০০ টাকায়। এতে করে কৃষককে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেক কৃষকের পেঁয়াজ ক্ষেতেই পড়ে আছে।
দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ফেলু মোল্লার পাড়া গ্রামের মো. আবুল হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদে খরচ হয়েছে ৭০-৭৫ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি উৎপাদন হয় ৪০-৪৫ মণ। আর যদি খুব ভালো ফলন হয় তবে ৫০ মণ। বর্তমান পেঁয়াজের বাজারদর অনুযায়ী খরচের অর্ধেক দামও পাওয়া যাচ্ছে না। গতকাল বৃহস্পতিবার গোয়ালন্দ বাজারে ৭০০-৮০০ টাকা মণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে। এবার পেঁয়াজের আবাদ করে তাঁকে অন্তত ৮ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হবে।
গোয়ালন্দ আড়তপট্টির ব্যবসায়ী মো. আব্দুল হালিম সেখ বলেন, এখান থেকে পেঁয়াজ কিনে দেশের বিভিন্ন মোকামে গিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। মোটা অঙ্কের টাকা লোকসান দিয়ে বিক্রি করে আসতে হচ্ছে। তাই তারাও পেঁয়াজ কম কিনছেন। তবে তাঁর আশা, সামনে ঈদ। হয়তো চাহিদা কিছুটা বাড়বে, তখন দামও কিছুটা বাড়বে।
এ বাজারের আড়তদার মো. সুজন সারওয়ার জানান, পেঁয়াজের বাজার পড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁর আড়তের অনেক ব্যাপারী পেঁয়াজ কিনে ফেলে চলে গেছেন। দিনের পর দিন খোঁজও নিচ্ছেন না। তারা ঢাকার বাজারে দাম কম থাকায় হয়তো পেঁয়াজগুলো নিচ্ছেন না। তিনি আরও জানান, চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজের উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম পড়ে গেছে। রোপণ মৌসুমে গুটি পেঁয়াজের (বীজ) দাম কিছুটা কম থাকায় এ বছর কৃষকরা পেঁয়াজ আবাদও বেশি করেছেন। তাই এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে তাঁর ধারণা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর গোয়ালন্দে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাজার ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। কৃষকের সুবিধার্থে উৎপাদিত পণ্যের একটি মূল্য নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন। তা না হলে পেঁয়াজের উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
- বিষয় :
- পেঁয়াজের বাজার
