বেশিরভাগ তেল পাম্প বন্ধ, কোনো একটি খোলার খবর পেলেই ছুটছে মানুষ
তেল সংকটের গুজবে ফিলিং স্টেশনে তেল সংগ্রহে হুড়োহুড়ি (ছবি-তাজনুর রহমান)
মেহেরপুর ও শৈলকুপা (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ | ১৯:০৪ | আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২৬ | ১৯:০৬
মেহেরপুরের অধিকাংশ তেল পাম্প বন্ধ করে রেখেছেন মালিকরা। যেখানে পাম্প খেলার খবর পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই ছুটছে মানুষ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ২শ থেকে ৫শ টাকার তেল নিতে পারছেন ক্রেতারা। তবে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে পাচ্ছেন, কেউ কেউ না পেয়েই ফিরছেন।
বাস ট্রাকগুলো তাদের নির্ধারিত পাম্প থেকে তেল নিতে পারছে। ফোন দিয়ে ডেকে নিয়ে বন্ধ পাম্প খুলে নিয়মিত কাস্টমারদের তেল দিয়ে ফের বন্ধ করে রাখছেন মালিকরা। তবে অনিয়মিত বাস-ট্রাকে তেল দেওয়া হচ্ছে না।
তেল সংকট হবে- গত ৫-৬ দিন ধরে এমন খবরে ক্রেতারা পাম্প থেকে বেশি করে তেল কিনে নিয়ে যাওয়ায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান পাম্প মালিকরা। এখন ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরররাহ না পাওয়ায় সংকট আরও বাড়ছে। সংকট থেকে উত্তরণের কোনো খবরও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে এবার বোরো চাষ বিঘ্ন হবে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
মেহেরপুর সদর উপজেলার উজুলপুর গ্রামের কৃষক ওহিউল ইসলাম বলেন, তিনি ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছেন। তার শ্যালো মেশিনের অধীনে আড়াইশ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হয়। ৩-৪ দিন ধরে পাম্পগুলো ঘুরে অল্প অল্প করে ডিজেল পেলেও আজ দুদিন ধরে কোনো ডিজেল কিনতে পারেননি। ফলে ধানের জমিতে সেচ দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেছে।
একই গ্রামের চাষি কফেল উদ্দিন বলেন, ধানে এখন নিয়মিত সেচ দেওয়া জরুরি। ডিজেলের অভাবে আজ দুদিন পানি দিতে পারিনি। জমি শুকিয়ে গেলে ধানের উৎপাদন ব্যাহত হবে। সরকারের উচিত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাষিদের আগে ডিজেল দেওয়া। তা না হলে চাষিরা ক্ষতির মধ্যে পড়ে যাবে।
কাঁচামালের আড়তদার মিজানুর রহমান বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাবে ও সংকট হবে এমন কথা ছড়িয়ে পড়ায় আমার পিকআপ ও মোটরসাইকেলের জন্য তেল নিতে এসেছি। তবে তেলের দাম না বাড়লেও তেল সংকট ঠিকই হয়ে গেছে । ৫টি পাম্প ঘুরে একটি পাম্পে কিছু তেল পেয়েছি। মোটরসাইকেলের জন্য ৩শ টাকার অকটেন পেয়েছি। তাও পুলিশ লাইনের পাশে নুর ফিলিং স্টেশনে যেতে হয়েছে। অন্যান্য পাম্প বেশির ভাগই বন্ধ রয়েছে।

পেপার হাউজের ম্যানেজার গোলাম মাহাবুব লাল্টু বলেন, জেলার সব উপজেলায় পেপার পাঠাতে গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছি না। মোটরসাইকেলের জন্য পেট্রোল-অকেটেন তো নেই বললেই চলে। এভাবে চলতে থাকলে সব বন্ধ করে বসে থাকতে হবে।
তেল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নুর হোসেন আঙ্গুর বলেন, তেলের দাম বাড়ার কোনো খবর আমাদের কাছে নেই। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের খবরে মানুষ আতঙ্কে পাম্পে ভিড় করছে। আমরা মজুদ অনুযায়ী নির্ধারিত মূলেই তেল বিক্রি করছি। তবে কোনো কোনো পাম্পের মজুদ শেষ হয়ে গেলে ক্রেতারা তা মানতে না চাওয়ায় বাধ্য হয়ে পাম্প বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক ড সৈয়দ এনামুল কবির বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজক। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনেকেই আতঙ্কে তেল কিনছে। তবে বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। পাম্প মালিকরা প্রাপ্যতা অনুযায়ী তেল বিক্রি করছে। জেলা প্রশাসন থেকে পাম্পগুলোতে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।
শৈলকুপায় পাম্পগুলোতে দীর্ঘলাইন ও হুড়োহুড়ি
ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কাকায় ঝিনাইদহের শৈলকুপায় তেল পাম্প গুলোতে দীর্ঘ লাইন ও হুড়োহুড়ি দেখা গেছে। শুক্রবার সকালে গাড়াগঞ্জ এলাকার তেল পাম্প ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়। সরকার তেলের দাম না বাড়ালেও অবৈধ পেট্রোল, ডিজেল ব্যবসায়ীরা পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি লিটারে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছে। প্রশাসন পাম্প থেকে অবৈধ তেল ব্যবসায়ীদের কাছে তেল বিক্রি বন্ধের ব্যবস্থা না করলে এ চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
জ্বালানি তেলের গ্রাহক আউশিয়া গ্রামের আজিজুর রহমান বলেন, তার একটি গাড়ি রয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে স্থানীয়ভাবে তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। সবাই তেল সংকটের কথা বলছে।
গাড়াগঞ্জ এলাকার জেভি ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মোজাফফর হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার সেহরি থেকে শুরু হয়েছে গ্রাহকদের হুড়োহুড়ি আর দীর্ঘ লাইন। তবে তারা তেল সরবরাহ একটু কমিয়েছেন। প্রত্যেককে দুইশ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে যাতে সবাই পায়।
তিনি বলেন, তাদের চাহিদার তুলনায় ডিপো থেকে অর্ধেক তেল দেওয়া হচ্ছে। তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে পাম্প ম্যানেজার বলেন, তেলের দাম বাড়ানো হয়নি।
একই এলাকার হান্নান ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার জসিম উদ্দিন বলেন, তেলের কোনো সংকট নেই। যেকোনো পরিবহনে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কেউ তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, কোনো ফিলিং স্টেশন থেকে পরিবহন ছাড়া অবৈধ মজুদের জন্য তেল বিক্রি যেন না হয় সে জন্য প্রতিটা পাম্পে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।
- বিষয় :
- তেল
- জ্বালানি তেল
- শৈলকুপা
- ঝিনাইদহ
